অতনু রায়

কলকাতা, সেপ্টেম্বর ২৩: গণতন্ত্র না কর্পোরেটতন্ত্র, ক্ষমতার উৎস আসলে কোনখানে? এই অতিপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে পুনে এমআইটি আয়োজিত ১২ তম ভারতীয় ছাত্র সংসদে নিজের বক্তব্য রাখতে উপস্থিত হয়েছিলেন কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের (Benaras Hindu University) ছাত্রী নম্রতা ভার্মা। আলোচনায় বারবার উঠে এল তাঁর সচেতন রাজনৈতিক মননের পরিচয়।

নম্রতা’র কথায়, “ভারতীয় ছাত্র সংসদের এটা বিশেষত্ব যে এখানে যেরকম পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদরা বক্তব্য রাখেন তেমনভাবেই ছাত্রসমাজের বক্তব্যও এখানে শোনা হয়। এটাই ভারতীয় ছাত্র সংসদ’কে অন্য সমস্ত মঞ্চের থেকে আলাদা করে দিয়েছে এবং আমাকেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছে।”

নিজের রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে একই মঞ্চের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের বক্তব্যের কতটা মিল পেলেন? নম্রতা’র সোজা কথা, “আমার মতামত হল, ক্ষমতার মূল উৎস এবং কেন্দ্রস্থল হচ্ছে জনগণ। তাই সমন্বয়ই পথ। কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির কথাতেও একই ভাব উঠে এসেছে। তবে শুধু যে মতের মিলই পেয়েছি তেমনটা নয়, অমিলও অবশ্যই পেয়েছি।”

ছত্তিশগড় থেকে হিন্দি সাংবাদিকতা পড়তে বেনারসে পৌঁছানো নম্রতা’র মতে সংসদীয় রাজনীতিতে সংশোধন আনার অন্যতম প্রধান উপায় ভোট দেওয়া। তাঁর মতে, “রাজনীতি কিন্তু কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়, বরং একটা সামগ্রিক ব্যাপার। রাজনীতি মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রত্যেকটা বিষয়কে প্রভাবিত করে। তাই আমার মনে হয় সর্বপ্রথম মানুষকে বোঝাতে হবে যে তাঁর ভোটাধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাধিকার গণতন্ত্র এবং রাজনীতির সব থেকে বড় শক্তি। কারণ এর মাধ্যমেই কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে তাঁর অংশীদারিত্ব করতে পারেন। আমাদের উচিৎ নিজেদের পাশাপাশি আমাদের পারিপার্শ্বিকে এই সচেতনতার প্রসার ঘটানো।”

রাজনৈতিক সচেতনতা প্রসঙ্গে নম্রতা’র বক্তব্য, “আমার মতে, প্রশ্ন করাই আসলে রাজনৈতিক সচেতনতা। আর গণতন্ত্র কিন্তু প্রত্যেক মানুষকে প্রশ্ন করার অধিকার দেয়। কিন্তু কোনোভাবে আজকের নাগরিক সমাজ প্রশ্ন করেন না। যদি কোনো নীতির প্রয়োগ হয় অথবা কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাহলে সেটা কেন নেওয়া হল! সেই প্রশ্নটা এখন কেউ করেন না।”

একইসঙ্গে নাগরিক কর্তব্য নিয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল স্নাতকোত্তর পর্যায়ের এই ছাত্রীর কথায়, “আমাদের নাগরিক কর্তব্যগুলো ঠিকঠাক পালন করা প্রয়োজন। এটাও কিন্তু সমাজের উন্নতি বা সংশোধনের পথে একটা বড় পদক্ষেপ হতে পারে।”

কখনও কি প্রত্যক্ষ রাজনীতির মঞ্চ পাবে নম্রতাকে? সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে অকপট নম্রতা জানালেন, “ভবিষ্যতে কি আছে সেটা তো আমি জানি না তবে বর্তমানে আমার একমাত্র লক্ষ্য সাংবাদিকতা এবং সেটাই করতে চাই। তবে পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক চেতনা উদ্রেক করবার জন্য যে যে কাজ করার প্রয়োজন সেগুলো আমি অবশ্যই করব। কোনও কাজ নিয়েই আমার ছুৎমার্গ নেই। যদি এরকম কোনও অবকাশ তৈরি হয় যাতে আমাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে হয় তখন অবশ্যই সেটা করব।”

সাংবাদিকতার ছাত্রী হিসেবে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে আজ কতটা দৃঢ় মনে হয় জানতে চাওয়ায় নম্রতার সপাট জবাব, “গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বর্তমানে একরকমের আদর্শগত মেরুকরণের শিকার। মেরুকরণ ব্যাপারটা আমার খুব একটা ভাল লাগে না। এছাড়াও একটা চরমপন্থী মনোভাব দেখা যাচ্ছে যেটা আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেখা যায় নি। বিশেষত আমি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কথা বলছি। সংবাদপত্র এবং ডিজিট্যাল মিডিয়া এই মুহূর্তে আমার মনে হয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার থেকে অনেক ভাল জায়গায় আছে। ডিজিট্যাল মিডিয়া একটা অল্টারনেটিভ মিডিয়া হিসেবে তৈরি হয়ে প্রায় ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে প্রতিস্থাপন করে দেওয়ার জায়গায় পৌঁছেছে।”

নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ারও পক্ষপাতী নয় নম্রতা। তাঁর কথায়, “আমরা যারা সাংবাদিকতা পড়ছি, তাদেরও একটা নৈতিক দায়িত্ববোধের জায়গা তৈরি হয়। তাদেরকে নিজেদের লেখার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। আজকে তো ফ্রিল্যান্সিং একটা খুব বড় জায়গা তৈরি করেছে। তাই এখনই খুব একটা নৈরাশ্যবাদী হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না কিন্তু একজন নতুন প্রজন্মের সাংবাদিককে নিজেকে সমস্ত কিছুর থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হয়ত কাজটা খুব কঠিন কিন্তু চেষ্টা করলে পারা যাবে।”

বাক্-স্বাধীনতার প্রসঙ্গে নম্রতা’র বক্তব্য, “যদি আমি বেনারসের কথা বলি তবে এখনও এমন কোনও পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি যেখানে বাক্-স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। বিভিন্ন মতামত অবশ্যই রয়েছে তবে যে যার নিজের কথা বলার সুযোগ পায়”।

Loading

Spread the love