অতনু রায়

কলকাতা, সেপ্টেম্বর ৩: সদ্য মুক্তি পেয়েছে এসএসআর সিনেমাস্ প্রযোজিত বাংলা ছবি ‘সীমান্ত’। ছবির কলাকুশলীদের সীমান্ত ভাবনা জানা গেল একান্ত এক আড্ডায়। পরিচালক সুমন মৈত্র নিজের সীমান্ত ভাবনায় কাঁটাতারের বেড়াকেই বোঝেন। বললেন, “আমার কাছে সীমান্ত সেই বর্ডার লাইন যা ভারত-বাংলাদেশকে আলাদা করেছে। যে বর্ডার লাইন ত্রিপুরা, মেঘালয়, অসমের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দিয়ে গেছে। আর আমার গল্পটা সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে”।

ছবির অন্যতম অভিনেতা সাহেব ভট্টাচার্যের কাছে অবশ্য সীমান্ত ভাবনা বেশ গভীর, যা আবার ছবির সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সাহেবের কথায়, “এই মুহূর্তে সীমান্ত শুনলে আমার অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল বর্ডারের কথাই মনে পড়ে। এটা কিন্তু আমাদের ছবিরও প্রশ্ন। দুটো বাচ্চার নিষ্পাপ একটা ভালবাসা আর বন্ধুত্বের সম্পর্কের মাঝখানে সীমান্তটা দরকার কিনা সেই প্রশ্নটা তুলে দেবে এই ছবি। আর যদি সত্যিই দরকার থাকে, তাহলে সেই দরকারটা কাদের আছে, এই প্রশ্নও উঠবে”।

ছবিতে ইন্ট্যালিজেন্স অফিসারের ভূমিকায় অভিনয় করা পায়েল সরকারের কাছে অবশ্য সীমান্ত ভাবনা বদলেছে সময়ের সাথে সাথে। পায়েলের কথায়, “সীমান্ত বললেই মনে পড়ে ছোটবেলায় প্রথমবার পুরীর সমুদ্র দেখার কথা। তখন মনে হত যে আকাশটা মিশে গেছে সমুদ্রে, ওইখানটাতেই শেষ, ওটাই সীমান্ত। তারপর আস্তে আস্তে যত পড়তে থাকলাম, ইতিহাস জানতে থাকলাম ততই সীমান্ত ভাবনাটা বদলাতে থাকল”।

এমন একটা সময়ে ছবির মুক্তি হল যে সময়ে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল সীমান্ত নিয়ে। তাতে ছবির কিছুটা শাপে-বর হল কিনা প্রসঙ্গে পরিচালকের মত, “এটা খুব কাকতালীয়। যখন আমরা ছবিটা বানিয়েছিলাম, তখন কিন্তু এসব কোনও ব্যাপার ছিল না। হঠাৎ করেই রাজ্য রাজনীতি বা দেশীয় রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যাচ্ছে যেগুলো সীমান্তের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। ছবির জন্য ভাল হতেও পারে আবার জানিনা এ থেকে অন্য কিছু তৈরি হবে কিনা”।

বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে ‘সীমান্ত’ ছবি হিসাবে আলাদা প্রাসঙ্গিকতা পাবে কিনা সে হিসাব যদিও বা কালের ঘরে, তবে আজকে ছবির গল্প লিখলেও গল্পের বদল করতেন না সুমন। বললেন, “আমি যে গল্পটা বলছি, সেগুলো আমি নিজে দেখেছি। আমি অনেকটা সময় সেই জায়গাগুলোতে কাটিয়েছি। আমার রিসার্চে অনেকটা সময় গেছে। আমার অনুভব এই ছবি। তাই বদলাতাম না”।

ইন্ট্যালিজেন্স অফিসারের ভূমিকায় অভিনয়ের আগে পুলিশের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের কাজ সম্পর্কে নিজের ধারণা প্রসঙ্গে পায়েলের কথা, “পুলিশ ডিপার্টমেন্টের এই ভাগগুলো সম্পর্কে আমার ভাসা-ভাসা ধারণা ছিল। যখন সুমন দা গল্পটা বলছিলেন তখন তাই আমার অনেক প্রশ্ন ছিল। সেগুলো কথা বলতে বলতে আস্তে আস্তে ক্লিয়ার হয়েছে। এই স্ট্রাকচার বা হায়ারার্কি সম্পর্কে আমার এখন একটা পরিস্কার ধারণা তৈরি হয়েছে”।

এমন একটা কঠিন সময়ে যখন বেশিরভাগ ছবিই সিনেমাহলে মুখ থুবড়ে পড়ছে সেখানে এমন একটা ছবি থিয়েটারে মুক্তি দেওয়াতে কি একেবারেই ঝুঁকি ছিল না? সুমনের কথায়, “ছবি বানানোটা চ্যালেঞ্জিং, সেটাকে এক্সিকিউট করা আরও চ্যালেঞ্জিং এবং সেটা থিয়েটার পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে মুক্তি দেওয়া আরও চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমি সবসময় মনে করি যে, কন্টেন্ট ইজ্ দ্য কিং। যদি সত্যিই গল্পটা ভাল হয় তবে ওয়ার্ড অব্ মাউথ পাবলিসিটিতে মানুষ এখনও ছবি দেখতে যায়। গল্পটা যদি মানুষকে ইমোশনালি নাড়া দেয় তাহলে মানুষ ঠিকই দেখবে। কারণ, ইমোশন ছাড়া গল্প হয় না আর ইমোশন ছাড়া সিনেমাটাও হয় না। আবার এটাও ঠিক যে, কোনও ছবি ওয়ার্ক করছে না সব ছবিই প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ছে, সেটা একেবারেই ভাল দিক নয়। এটা তো একটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই খারাপ কিন্তু কোথাও গিয়ে মানুষকে কাজটাও করতে হবে”।

একই প্রশ্নে অবশ্য অনেক সরাসরি সাহেব। সাহেবের কথায়, “আমাদের এই ছবির থিম আসলে সবার উপরে মনুষ্যত্ব, তাহার উপরে নাই। আজকে যেরকম ধর্মবিদ্বেষ সারাদেশে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এরকম একটা প্রশ্ন তোলা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণও বটে। তবে ঝুঁকি যতটা তার থেকে বেশি আমি বলব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ছোট ছোট কথা আমরা সকলেই বলতে চাই কিন্তু বলতে পারিনা। ছোটবেলা থেকে যে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ঈদের বিরিয়ানি খেয়েছি আজ তার ব্যাপারে আমাদের মনকে বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে! উত্তর কলকাতার সব থেকে বড় দুর্গাপুজো যে জায়গাটায় হত, সেই জায়গাটার নাম মহম্মদ আলী পার্ক। এরকম একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নগুলো তোলা হচ্ছে সেই প্রশ্নগুলোর কি আদৌ দরকার আছে? সেই প্রশ্নগুলো কি কিছুটা হলেও মানুষকে প্রভাবিত করছে? তাই এই ছবি দরকার ছিল”।

ছবির অন্যতম অভিনেতা রণজয় অবশ্য আলো ফেললেন অন্য এক প্রাসঙ্গিক দিকে। তাঁর কথায়, “আজকে ওটিটির এই রমরমা কেন হল? কারণ ওটিটি আসলে যেটা দেখানো শুরু করল সেটা, সত্যি। ‘মির্জাপুর’ হিট হয়েছিল শুধুমাত্র দুর্দান্ত অভিনয় এবং প্রচণ্ড গালিগালাজ ছিল বলে তো নয়, আসলে সেখানে সত্যি দেখানো হয়েছিল। আমার মনে হয় ‘সীমান্ত’ও সেই সত্যিটা দেখাচ্ছে। কোনও অতিরঞ্জন নেই, নাচ-গান, ফালতু সংলাপ, অযথা প্রেম, কিচ্ছু নেই। দুটো বাচ্চা, যারা এই গল্পের ধারক এবং বাহক তাদের ইমোশনাল জার্নিটা দেখাবে এই ছবি। এই জার্নিটা কোনও জায়গায় গিয়ে মিথ্যে বলে মনে হবে না, মনেই হবে যে আমি একটা সত্যি দেখছি এবং কোনও কিছুর সাক্ষী হচ্ছি। তাই আমার মনে হয় সত্যি দেখতে মানুষ আসবেনই”।

প্রতিটা পেশার নিজস্ব একটা রাজনীতি থাকে আর সেই সব রাজনীতি সামলে চলতে পারাই পেশাদারিত্ব। পেশার রাজনীতির সীমান্ত আছে না কি অসীম প্রসঙ্গে সাহেব স্পষ্টবাদী। বললেন, “সমস্ত পেশার একটা রাজনীতি আছে এটা ঠিকই। ফুটবলের রাজনীতি আছে, অভিনয়েরও রাজনীতি আছে। কিন্তু যেদিন থেকে ফুটবলের মধ্যে বাইরে থেকে রাজনীতি ঢুকেছে বা অভিনয়ের মধ্যে বাইরে থেকে রাজনীতি ঢুকেছে সেই সময় থেকেই কিন্তু গড়বড়টা তৈরি হয়েছে”।

সীমান্তের মানুষদের আশু প্রয়োজন প্রসঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করার প্রবণতা থেকে একসময় সংসদীয় রাজনীতি করতে যাওয়া পায়েলের মতে, “আমি মনে করি কারো জন্য কিছু করতে গেলে রাজনীতি করার দরকার নেই। যদি ভাল করতে চাও সেটা কিন্তু এমনিই করা যায়। তবে রাজনৈতিক একটা ব্যাকআপ থাকলে অবশ্যই আরও বড় ভাবে করতে পারা যায়। কারণ, প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজের করার ক্ষমতা খুব সীমিত। তবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আমরা চাইলেও নিজেরা গিয়ে কিছু করতে পারি না এটা সত্যি। আমাদেরকে অনেক কিছুর উপর নির্ভর করতে হয়। তবে আমার মতে প্রথমে এটুকু নিশ্চিত করা দরকার যে তাঁরা যাতে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে পারেন”।

তবে বাংলা ছবি নিজের সীমান্ত বাড়াতে না পারার ব্যাপারটাকে পরিকল্পনার অভাব বলতে একটুও কুন্ঠিত নন নতুন প্রজন্মের সাহেব। সরাসরি বললেন, “আমার মনে হয় বাংলা ছবির সীমান্তটা আমরা পেরোতে পারিনা পরিকল্পনার অভাবে। অনেক জায়গার ছবি আমরা দেখি যে বিভিন্ন ভাষাতে ডাবিং করে দেখানো হয়। এতে কি হয়, দীর্ঘদিন ধরে অন্য ভাষার ছবি বিভিন্ন চ্যানেলকে কম পয়সায় দিয়ে বারবার দেখাতে দেখাতে যখন তাদের ওখান থেকেই একটা বড় কিছু আসে তখন কোনও অভিনেতার কাজ আমাদের ভাল লেগে যায়। আমরা তখন ভেবে দেখি না যে আগে ১০-১২ বছর ধরে তাঁরা ভাল-খারাপ, বড় বাজেট-ছোট বাজেট সমস্ত কিছুকে ‘পুশ’ করে গেছে। তার পরেই তার সেই বাজার তৈরি হয়েছে। আমরা কেন আজকে আমাদের ‘বিসমিল্লাহ’, ‘লক্ষী ছেলে’, ‘কাছের মানুষ’ বা ‘সীমান্ত’কে ৬-৭ টা ভাষায় ডাবিং করে দেখাতে পারব না? তাতেই আজ থেকে ১০-১২ বছর পরে আমাদের অভিনেতাদেরও কিন্তু সারা ভারতের মানুষ চিনবে, তাদের কাজ দেখবে”।

চরিত্র বাছাই নিয়ে সুমনের বক্তব্য, “যখন স্ক্রিপ্ট লিখছিলাম তখন থেকেই কিছু চরিত্রের কথা মাথায় রেখেছিলাম। আমার একটা ব্যাপার আছে, যাদের সঙ্গে কাজ করব তারা যদি ভাল মানুষ না হয় তাহলে আমার কাজ করতে খুব অসুবিধা হয়। এইখানে পায়েল, সাহেব, রনজয় বা মৈনাক প্রত্যেকেই যে চরিত্রটা করছে তাঁরা কেউই এরকম চরিত্র আগে করেনি। এই ধরণের বিষয় নিয়ে ছবিও খুব সম্ভবত বাংলায় আগে হয়নি”।

Loading

Spread the love