অতনু রায়

কলকাতা, এপ্রিল ১৪: মানুষের জীবনের সারসত্য নিশ্চিতভাবেই জন্ম আর মৃত্যু। কিন্তু বেঁচে থাকার সার হল ক্রাইসিস। প্রতিটা মানুষের জীবনে চলার পথেই কিছু না কিছু ক্রাইসিস লুকিয়ে থাকে যা অর্থনৈতিক আর শ্রেণিগত বৈষম্যের ঊর্ধ্বে। যেদিন সব ক্রাইসিস ফুরিয়ে যায়, সেদিন জীবনের নটেগাছটাও মুড়িয়ে যায়। আর এই ক্রাইসিসের গল্পই বলতে চেয়েছেন পরিচালক অতনু ঘোষ তাঁর এগারো নম্বর ছবি ‘শেষ পাতা’তে। অবশ্য অতনু বরাবরই তাইই করেছেন।

পেল্লাই দক্ষিণী এবং বড় বাজেটের কল্পনির্ভর হিন্দী ছবির বাজারে দাঁড়িয়ে ‘শেষ পাতা’ আদ্যন্ত গল্পনির্ভর একটা ছবি। যেখানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো মহীরুহ নিজেকে নিঙড়ে নিখুঁত বাল্মিকী হয়ে উঠলেও ছবিটা কেবল প্রসেনজিতের হয়ে যায়না। এই জায়গাতেই আসে গল্পবলিয়ের পরিমিতি বোধের প্রশ্ন। আর এখানে অতনু ১১ এ ১১। নাম-কা-ওয়াস্তে চরিত্র সে লেখে না। ওঁর ছবির প্রতিটা চরিত্র দরকারি। তাই বাল্মিকী, মেধা, শৌনক, দীপা জড়িয়ে পড়ে পাকেচক্রে নয়, সময়ের অমোঘ নিয়মে।

আমি একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, গড়পড়তা বাংলা ছবির সব থেকে বড় ক্রাইসিসের জায়গা হল চিত্রনাট্য। সেটা সিংহভাগ পরিচালক না বুঝলেও যে কয়েকজন বাঙালি পরিচালক সেটা জানেন অতনু তাঁদের অন্যতম। একজন পরিচালকের সবচেয়ে বড় গুণ হওয়া উচিত লোভ সংবরণ আর এই জায়গায় অতনু ফুল মার্কস পাবেন। এই ছবিতে অনেক জায়গাতেই আরও বেশি কিছু দেখানোর সুযোগ থাকলেও লোভ সংবরণ করে চিত্রনাট্যকে টানটান রেখেছেন তিনি। আসলে অতনু ছবিটা বানানোর আগে দেখতে পান তাই সম্ভবত এক্সিকিউশনের সময়ে তাঁর ছবি খেই হারিয়ে ফেলে না। সিনেমা কিন্তু নৌকার মতো, যাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে হলে নাবিকের পথ জানা বড় জরুরী।

ব্যক্তিজীবনে বারেবারে দেখে, বিভিন্ন শিল্পীর জীবনী পড়ে বুঝেছি যে ভালনারেবলিটি আর আনপ্রেডিক্টেবলিটি যেকোনো শিল্পীর মননের দোসর। অর্থের বিনিময়ে কাজ করলেও প্রকৃত শিল্পীরা বারেবারে বুঝিয়ে দিয়েছেন উৎকৃষ্ট শিল্পের জন্য অর্থকেও অপেক্ষা করতে হয়েছে। কারণ, সৃষ্টির তাগিদ ছাড়া কেবলমাত্র ফরমায়েশে উন্নত শিল্প হতে পারেনা।

আর ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়েই অতনু বুনলেন ‘শেষ পাতা’। ছবির বাল্মিকী সেনগুপ্ত (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) লেখক। তাঁর অভিনেত্রী স্ত্রীর নগ্ন দেহ উদ্ধার হয় ময়দানে। বাল্মিকীকে প্রকাশক তাঁর স্ত্রীর গল্প লেখার জন্য টাকা দেয়। লেখা না পেয়ে প্রকাশনা সংস্থা নিয়োগ করে রিকভারি এজেন্সিকে। বাল্মিকীর কাছ থেকে লেখা জোগাড় করার দায়িত্ব পায় শৌনক (বিক্রম চট্টোপাধ্যায়)। লেখায় বাল্মিকীর অনীহা দেখে শৌনক নিয়ে আসে মেধা’কে (গার্গী রায়চৌধুরী) অনুলেখক হিসেবে। আর শৌনকের বাগদত্তা দীপা (রায়তী ভট্টাচার্য)।

অভিনয়ে প্রথমেই বলব বিক্রমের কথা। শৌনক চরিত্রের জন্য বিক্রম যে নিজেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়েছে সেটা পুরো ছবিতে ধরা পড়েছে। শৌনক কিন্তু বেশ কঠিন একটা চরিত্র। বেশকিছু স্তর রয়েছে চরিত্রটার। অনুভূতিহীনতা আর আবেগের একটা বিষম মেলবন্ধন আছে চরিত্রের বুননে। আর সেই দোলাচলতাকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে বিক্রম। ‘শেষ পাতা’র বিক্রম বাংলা ছবির নতুন পাওয়া, নিঃসন্দেহে।

রায়তী এই ছবির দীপা। ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র। সততা এবং অশঠতা দুটো অভিব্যক্তিই এত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে পরবর্তীতে রায়তীর জন্য আলাদা করে কোনও ছবি দেখতে ইচ্ছে হতেই পারে। ওঁর অভিনয়ে মাপ বিষয়টি নিখুত আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক্সপ্রেশিভ চোখ যা দীপার মতই রায়তীর অভিনয় জীবনের সম্পদ হয়ে থাকলে অবাক হব না।

ছবির মেধা গার্গী। মেধা আদপে কতটা মেধার সঞ্চার করেছে ছবির মধ্যে সেটা দেখতে গেলে তো ছবিটা দেখতে হবে। তবে আপাত সহজ আদপে কঠিন চরিত্রটা হয়ে উঠেছেন গার্গী। এই ছবিতে গার্গী একইসঙ্গে দুরকমের অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন। একটা জায়গা থেকে সে যেন হারতে হারতে জিততে চলা একটা মানুষ আবার আরেক দিকে জেতার মুহূর্তে হেরে যাওয়া এক জীবনসৈনিক। আর এই দ্বৈততা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন গার্গী পুরো ছবি জুড়ে।

ছোট চরিত্রে কৃষ্ণেন্দু দেওয়ানজি এবং ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় মন কেড়েছেন।

এবার বলি এই ছবির বাল্মিকী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কথা। আমরা বহুদিন ধরে বহু ছবিতেই দেখেছি যে প্রসেনজিৎ নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙেচুরে নতুন রূপে উপস্থাপন করছেন। ব্যতিক্রম হল, এই ছবি শিল্পী প্রসেনজিতের সমস্ত সত্তাকে যেন বদলে দিয়েছে বাল্মিকীতে। নিজেকে নিংড়ে শেষ বিন্দু পর্যন্ত দিয়ে বাল্মিকীকে গড়েছেন ইন্ডাস্ট্রির বুম্বা দা। এই চরিত্র নিশ্চিতভাবেই বাংলা ছবির ইতিহাসে থেকে যাবে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের করা চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই চরিত্র। আর একটা কথা বলতেই হবে, বাল্মিকীর মতো একটা চরিত্র বাংলা ছবিতে রোজ রোজ আসেনা।

খুব যত্ন করেই ছবিতে বাল্মিকীর বাড়ির পরিপাট্যের অভাব রেখেছেন অতনু এবং আর্ট ডিরেক্টর গৌতম বসু। একদিকে একটা অগোছালো ভাব রয়েছে। আবার জিনিসের স্তুপে চাপা পড়ে থাকা ‘এইচএমভি ফিয়েস্তা’, যা বুঝিয়ে দেয় তার শৌখিন অতীত। আর এই ঘরকেই একেবারে বাল্মিকীচিত করে তুলেছে আলোর ব্যবহার। আর একটা কথা বলতেই হবে, টেবিলে ‘মধ্যরাতের সংকেত’ রেখে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং নিজের পছন্দের মানুষ-শিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেও হয়ত একটা চরিত্র করে রেখে দিলেন অতনু।

সৌমিক হালদারের ক্যামেরা এই ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র হয়ে উঠেছে। চরিত্রের অস্থিরতা তো ক্যামেরা দিয়ে ধরার নয়, তবুও সেই অসাধ্য সাধনই যেন করেছেন সৌমিক। সুজয় দত্ত রায়ের সম্পাদনা ছবির স্বাভাবিক গতিকে একেবারেই ব্যাহত করেনি।

দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গীতায়োজন নিয়ে নতুন করে কিছু বলার না থাকলেও এই ছবিতে নৈঃশব্দের সুর রচনা করেছেন তিনি। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং গার্গী রায়চৌধুরীকে দিয়ে গান গাওয়ানোর ব্যাপারটা যথেষ্ট কাজে লেগেছে। দৃশ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে তাঁদের খালি গলার গান।

চিত্রনাট্য লেখার সময়ে সুযোগের কোনো অপচয় করেন না অতনু। এক্ষেত্রেও তাই। একজন ম্যানুয়াল কালারগ্রেডিং টেকনিশিয়ান, যিনি আধুনিক ডিজিট্যাল প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় চলে গেছেন বিস্মৃতির অন্ধকারে, সে ক্রাইসিসের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। শুধু তুলে ধরা নয়, ফিল্মের ক্যানের ভিতরে ক্যালকুলেটর রাখার দৃশ্যের মতো ছোট ছোট ডিটেইলে সিনেমার প্রতি তাঁর থেকে যাওয়া ভালবাসাকেও ফুটিয়ে তুলেছেন।

শৌনক আর দীপার প্রেমের একটা আটপৌরে মন দেখিয়েছেন পরিচালক যা সমসাময়িক বহুলাংশে শরীরসর্বস্ব প্রেমের একঘেয়েমি কাটিয়ে দেয়। প্রেমে পড়ার ইচ্ছে উস্কে মন ছুঁয়ে ফেলার মত প্রেম অনেকদিন পরে এল বাংলা ছবিতে।

এই ছবি শিল্পীর নিঃসঙ্গতা, ফ্রাস্টেশনের সঙ্গে কমিটমেন্টের টানাপোড়েনকে তুলে ধরেছে। এক এক সময়ে বৃষ্টিও যেন কোথাও চরিত্রগুলোকে, সম্পর্কগুলোকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। তখন যেন বৃষ্টিও একটা চরিত্র, এক অবাধ্য অংকের ছাত্রীর মতো এক একটা সমীকরণ মিলিয়েছে আর এক একটা সমীকরণ বারবারে ঘেঁটে দিয়েছে। এই অর্থসর্বস্ব পৃথিবীতে এক নতুন সাদাকালো জীবনবোধের গল্প বলে এই ছবি। একটা সংলাপ, “আমরা তো কতকিছুই ধার নিই, শুধু টাকা নয়”, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

আমরা পড়েছি রত্নাকরের বাল্মিকী হওয়ার কথা। ‘শেষ পাতা’ কোনো একটা জায়গা থেকে হয়ত বাল্মিকীর আবার রত্নাকরের বুড়ি ছুঁয়ে বাল্মিকীতে ফিরে যাওয়ার গল্পও বলে।

বাল্মিকীর স্ত্রী রোশনির মৃত্যু এই ছবির সূত্রধর বলা যেতে পারে। কিন্তু আমার কাছে রোশনি এই ছবির রূপকও বটে। যাঁকে আমরা একবার ফটোফ্রেমে ছাড়া আর পুরো ছবিতে দেখি না সেই রোশনিই যেন আলো। রোশনিই যেন সেই আলো যা ছবির প্রত্যেকটা চরিত্র খুঁজে চলেছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ‘শেষ পাতা’ আসলে আলো খোঁজার গল্প। আলো, না রোশনি!

“রোশনিকে আর আমি দেখতে পাই না”, বাল্মিকীর এই সংলাপও যেন একটা মনের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার গল্পই কোন এক জায়গায় বলে। তাই হয়ত কন্ঠে আসে, “আমার জ্বলেনি আলো অন্ধকারে”! এই রোশনি, এই আলোই আসলে ‘শেষ পাতা’র অস্ফুট প্রথম শব্দ।

আর গার্গী’র কন্ঠে যখন শুনি “আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি”, তখন সত্যিই মনে হয়েছে ‘শেষ পাতা’ ছবিকেও একজন ভাল ছবির দর্শক হিসেবে আমাদেরও সব ভালবাসা দিতে হবে।

শেষে এটুকুই বলি, বাল্মিকীর ডান হাতে ঘড়ি পরার দৃশ্য খুব মন ছুঁয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমার মনে একটা সম্ভাবনাকেও উস্কে দিয়েছে। কোনোভাবে স্ত্রীর ঘড়িকেই আঁকড়ে ধরে রেখে সময়টাকেই কবজিতে বেঁধে ফেলতে চাইছে না তো বাল্মিকী? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে অবশ্যই দেখুন ‘শেষ পাতা’।

Loading

Spread the love