অতনু রায়

কলকাতা, জুন ২: দিনটা ৯ অক্টোবর, ২০১৬, অষ্টমী, রবিবার। অভিজিৎ ভট্টাচার্যের লোখন্ডওয়ালা দুর্গোৎসবের অনুষ্ঠান মঞ্চে এক পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই শিল্পী ছুটে বেড়াচ্ছেন মঞ্চের বামদিক থেকে ডানদিক।

একের পর এক গান ধরছেন সেই শিল্পী আর দর্শকাসনের একেবারে সামনের সারিতে বসে থাকা এক মধ্য তিরিশের খবর-দার হাজার জনের ভিড়ে বারবার একা হয়ে যাচ্ছে। তাঁর এক একটা গান কি এক অদৃশ্য যাদুবলে জীবনের জীর্ণ হয়ে যাওয়া পুরোনো অ্যালবামের এক একটা পাতা যেন খুলে দিচ্ছে আর দমকা হাওয়ায় স্মৃতির টুকরোগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিতে চাইছে আরব সাগরে। এক অদ্ভুত পরীক্ষা চলছে যেন স্মৃতিগুলোকে সলিল সমাধির হাত থেকে বাঁচানোর! এক অদ্ভুত দাবার বোর্ডে সাদা আমি – কালো আমি যেন মুখোমুখি হয়ে একে অপরের দিকে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলছে ‘চেকমেট’। বারবার জীবনের সেই মুহূর্ত গুলোকে চোখের সামনে এনে দিচ্ছে যেগুলো ভুলে গেছি ভেবেছি এতদিন। বাঁকা হাসি হেসে যেন কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে যাচ্ছে, রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে।

এই মধ্য-তিরিশ যেন সেদিন প্রথমবার আবিষ্কার করল যে, আমাদের অতীত স্মৃতিই আসলে পৃথিবীর সবথেকে বড় ব্লকবাস্টার মিউজিক্যাল। আমাদের প্রায় প্রত্যেকটা স্মৃতির টুকরো যে এক একটা গানের সঙ্গে জুড়ে থাকে সেটা বুঝতে ফিরে দেখতে হয়েছিল জীবনের অনেক অস্বস্তিকর অধ্যায়।

মঞ্চ থেকে অদ্ভুতভাবে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে আমার অ্যালবামের আরেকটা পাতা উল্টে সেই যাদুকর গেয়ে উঠছেন ‘জিসম্ মুঝে দে কে মিট্টি কা, শিশে সা দিল কিঁউ বনায়া…’। হাজার কোলাহলের মধ্যেও যিনি চুপ করে বসিয়ে রেখে আমার ভেতরটা উথালপাথাল করে দিলেন, সেই তিনি একইরকম নির্লিপ্তভাবে গেয়ে চলেছেন হাসিমুখে। এরকম অনুভূতি বারংবার হয়না, এরকম করে ছুঁয়ে যেতে খুব কম শিল্পী পারেন, এরকম ভাবে বিবেক সাজতে খুব কম কন্ঠ পারে… প্রথম দর্শনেই কেকে পেরেছিলেন।

চোখের জল মুছে অনুষ্ঠান শেষে মুগ্ধ বিস্ময়ে যখন তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হল আলাদা ঘরে, বুঝলাম তখনও বারবার ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যাচ্ছি স্কুলের দিনগুলোতে আর কানে বাজছে, ‘ইয়ারোঁ দোস্তি বড়ি হি হসিন হ্যায়’। যে হাতে গোনা ক’জন শিল্পীর গলা রেকর্ডে এবং মুখোমুখি একদম এক শুনতে লাগে, কেকে তাঁদের একজন। যেমন অভিজিৎ। আমি কি প্রশ্ন করব সব গুলিয়ে গেছে ততক্ষণে, মিশে গেছে নোনা জলে। বোকার মত বললাম, ‘কি অপূর্ব কন্ঠ, কি অদ্ভুত ভাল গান করেন’। হাসিমুখে আমার কাঁধে হাত রেখে যে কথাটা বললেন সেটা এই লেখাটা লিখতে লিখতেও শুনতে পাচ্ছি, ‘ভাল গান করতে ভাল গলা লাগে না, ভাল গান এখান থেকে আসে’ বলে বুকের বাঁ-দিকে হাত দিয়ে দেখালেন।

শুনলাম পরের সকালে একটা অনুষ্ঠানে যাবেন, বেলা ১২ টার ফ্লাইট। আজও জানিনা কেন, তবে দুম করে বলে বসলাম, এয়ারপোর্টে সী-অফ্ করতে যেতে পারি? নিজের ভেতরের পেশাদার সাংবাদিক সত্ত্বাও যেন ‘খুব ছড়াচ্ছিস’ বলে আওয়াজ দিচ্ছে। কিন্তু উল্টোদিক থেকে একটা হাত পিঠ চাপড়ে দিয়ে অনুমতিসূচক হাসি ফিরিয়ে দিল। গিয়েছিলাম পরেরদিন এয়ারপোর্টে। ছোটবেলা থেকে স্কুলে একসঙ্গে পড়া বন্ধুকে সী-অফ করে ফেরার অনুভূতি নিয়ে ফিরেছিলাম। কম কথার মানুষটার তাকানো আর হাসিই অনেক বেশি কথা বলে দিত। মনে হয়েছিল কত চেনা, কতদিনের বোঝাপড়া। বুঝতে পেরেছিলাম, সাধারণ যাপনের এক অসাধারণ উদাহরণ কেকে। আমি আজও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি শিল্পীর হৃদয় থেকে না এলে কখনোই কোনো গান শ্রোতার মন ছুঁতে পারেনা। এই চরম সত্যি যে শিল্পী বুঝে যান, তিনি ‘মৃত্যু-চেয়ে বড়’। এমনই এক মৃত্যুঞ্জয়, কেকে।

‘হম রহেঁ ইয়া না রহেঁ ইয়াদ আয়েঙ্গে ইয়ে পল’ বলে সেই কেকে চলে গেলেন! তাঁর প্রতিটা উচ্চারণকে এত বিশ্বাস করে আসার প্রতিদানে শেষের সবগুলো কথা রাখলেন না যে! ‘চল, আ মেরে সঙ্গ চল্’ শুধুই কি বলতে হয় বলে বলা? এই কথাটা ভাবতে ভাবতে সেইদিন রাত থেকে তাঁকে নিয়ে একটা লাইনও লিখতে পারি নি। যে মানুষটা তাঁর এক একেকটা গান দিয়ে অবলীলাক্রমে ছুঁয়ে গেছেন আমার কৈশোর, যৌবনের আলো-আঁধারি অধ্যায়গুলো, তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে এতবার আটকে যেতে হবে ভাবিনি তো কখনও! কোনও শিল্পীর রিয়্যাকশন চাই নি ফোন করে। আসলে কিছু মানুষের অবিচুয়ারি লিখতে নেই। শুধু মনের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ভিড় করে আসা কিছু কথা সাজিয়ে দিতে চেষ্টা করেছি।

আমি আজ তাঁর দশটা সেরা গান বেছে নিতে চাইনা। আমি এটা বলতেও চাই না যে, ইস্! অকালেই চলে গেলেন। আজ তাঁকে নিয়ে বিন্দুমাত্র শোকপ্রকাশ করার কথা মনে হচ্ছেনা। আজ বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছে অ্যালবামের কতগুলো রঙিন মুহূর্ত এক ঝটকায় বিবর্ণ হয়ে গেল বলে। আজ আসলে বিবর্ণ হয়ে গেছে একটা সময়। কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ আসলে আমাদের বেরঙিন এই চার দেওয়ালের জীবনে সাতরঙা ক্যালাইডোস্কোপ। একজন শিল্পীর চলে যাওয়া যখন মানুষের ব্যক্তিগত শোকের বাঁধ ভেঙে দেয় তখন আসলে জিতে যায় ভালবাসা। সেই ভালবাসা, যা ঝরে পড়ে চিবুক বেয়ে।

তাই সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে রঙিন ব্যাকগ্রাউন্ডে কেকে’র সাদা কালো ছবি দেখতে দেখতে বারবার হোঁচট খাচ্ছি। এক অমলিন হাসি আর শান্ত চাহনি মনে পড়ছে আর মনে হচ্ছে একেবারে ভুল এই ছবিগুলো। সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি উঁকি দিচ্ছে মনের কোণে। আসলে বোঝার একটা বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। বেরঙিন হয়েছে আসলে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড, কৃষ্ণ কখনও রঙ হারাতে পারেন না। তাই এ লেখার সঙ্গে আমার মনের কোণে উঁকি দেওয়া ছবিই থাকল।

শেষবারের জন্য স্পট লাইটের আলোয় দাঁড়ানো কেকে কন্ঠের যাদুকরী রোমান্সকে বিবেকের আয়না করে আবার ঠেলে দিলেন এক পরীক্ষার মুখে। তবে এই পরীক্ষা আত্মসমীক্ষণের। সোশ্যাল মিডিয়া জোড়া ঘৃণা, মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি আর পরশ্রীকাতরতার গভীর জঙ্গলে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে পারার পরীক্ষা। হাত ছেড়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে ‘ইয়ারোঁ মহব্বত হি তো বন্দেগী হ্যায়’ বলতে পারার পরীক্ষা।

আসলে কেকে’র চলে যাওয়া এমন এক কষ্টের কষ্টিপাথর যা চোখের জলে বুঝিয়ে দিল ঘৃণা এখনও আমাদের গলা টিপে মারেনি। দীর্ঘ নিঃশ্বাসে বুঝিয়ে দিল, যা কিছু জোর করে ভুলে ছিলাম তা আজও ভালবাসি। কে পারে এমন করে ভালবাসা জাগিয়ে যেতে! এ যে অমানবিকতার মঞ্চে মনুষ্যত্বের সাউন্ড চেক এক অমর্ত্য কৃষ্ণর…অব কহনা অউর কেয়া, জব তুনে কহ দিয়া অলভিদা!

Loading

Spread the love