অতনু রায়

কলকাতা, অক্টোবর ২১: তাঁর ছবি ‘হৃদমাঝারে’ বাংলা ছবিকে দিয়েছিল দমকা বাতাস। তারপরে ভিন্ন রঙে ‘রঙ বেরঙের কড়ি’ দিয়ে ছুঁয়েছেন দর্শকমন। তাঁর ছবি ‘আহা রে’ দেখে হয়েছে দর্শকের রসনাতৃপ্তি। এবার নিজের চতুর্থ ছবি নিয়ে হাজির তিনি। সদ্য মুক্তি পেল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় অভিনীত এবং আভা ফিল্ম প্রযোজিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র ট্রেলার। ট্রেলার লঞ্চের ফাঁকেই আড্ডা দিলেন পরিচালক রঞ্জন ঘোষ

প্রশ্ন: রঞ্জন, তুমি একাধিক ভাল ছবি বানিয়েছ। ছবি তৈরির আগে আবার ভাল করার কতটা চাপ থাকে?

রঞ্জন: আমি সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি যে, আমি নয় বরং আমার কাজেরই কথা বলা উচিত। আমি এটাও সবসময় বিশ্বাস করেছি যে একটা ছবি সবথেকে বড় ‘পাবলিসিটি ভেহিকল্’। আমি ভাল ছবির প্রেসার হিসেবে ব্যাপারটাকে সেভাবে হয়ত দেখিনি কারণ, আমার মনে হয় ছবি করে যাওয়াই আমার কাজ। কিন্তু এই ছবিটার ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে যে আমরা একটা যুদ্ধের পর্যায়ে ছবিটা করে চলেছি। প্রথমত, ২০১৯ সালে ছবিটা প্ল্যান করা তারপর ২০২০তে কোভিড সিচ্যুয়েশন হয়ে যাওয়া এবং তারপরে ২০২১-এ দুটি পর্যায়ে কোভিডের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ পেরিয়ে আমরা ছবিটা শেষ করি। তারপর থেকে আমাদের দীর্ঘ একটা পোস্ট প্রোডাকশন চলে এবং ছবিটা ধীরে ধীরে কোনও তাড়াহুড়ো না করেই আমরা করেছি। আমার কোর টিমে যে তিন-চারজন ছিলেন তাঁদের সাহচর্যে ছবিটা আজকে কোনও একটা জায়গায় হয়ত পৌঁছেছে তাই ট্রেলার লঞ্চের দিনে আমি চাপমুক্ত। আর চাপটা ছিল এই পুরো প্রসেসটা নিয়ে, আমার নিজের কাজের এক্সপেক্টেশন নিয়ে চাপ ছিল না। ছবিটার কাজের চাপ আমাদের উপর খুব ভালভাবেই ছিল। ছবিটিতে এতজন অভিনয় করেছেন আর তার পাশাপাশি এত দীর্ঘ পোস্ট প্রোডাকশন সামাল দেওয়ার একটা চাপ আমার উপরে ছিল। তবে এখন অনেকটাই চাপমুক্ত।

প্রশ্ন: আমার অবজারভেশন, এই ছবির টিজার এবং ট্রেলারের মধ্যে একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে। টিজারে একটাই মাত্র সংলাপ রাখা হয়েছে, বাকিটা ভিজ্যুয়াল আর ট্রেলার একেবারে উল্টো পথে হেঁটে সংলাপে ভরপুর। এটা কী ভাবনা-চিন্তা করে করা?

রঞ্জন: একদমই ভেবে রাখা। টিজার এবং ট্রেলার তো মূলত ছবির একটা প্রবেশপথ যেখানে ছবির একটা আভাস দেওয়া থাকে। টিজারে আমি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলাম ভিজ্যুয়ালি সঙ্গে একটা হয়ত সংলাপ শুনল। সেটাতে আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। তারপরে আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রেলারটি করি। আমার ট্রেলার যিনি করেছেন, আমার সম্পাদক আর আমরা একসাথে বসে ঠিক করি যেহেতু আমাদের ছবিটা সিনেমা এবং থিয়েটারের মেলবন্ধন তাই এবারে দর্শককে কিছু আভাস দেওয়া যাক যে এই ছবিটা থেকে তাঁরা কি আশা করতে পারেন। শুধুই কি ভিজ্যুয়াল না আরও অন্য কিছু! সেই জায়গা থেকেই আমাদের সংলাপের অবতারণা এবং সংলাপের আধিক্য বলা যেতে পারে ট্রেলারে।

প্রশ্ন: তুমি এমন একটা বিষয় নিয়ে কাজ করছ যা সবসময়ই প্রাসঙ্গিক। অনেকক্ষেত্রেই নারীকেন্দ্রিক ছবিতে যেমন নারীকে প্রজেক্ট করার জন্যই ছবি বানানো হয় এক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। নারীকেন্দ্রিক ছবি হলেও এখানে একটা পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট মনে হয় থাকছে। যদি খুব নির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করি কি বলবে, একটা নারীকেন্দ্রিক ছবি না একটা রাজনৈতিক ছবিও বটে?

রঞ্জন: নারীদের জন্য হয়ত কিন্তু নারীকেন্দ্রিক কথাটায় আমার হয়ত একটা মৃদু আপত্তি থাকতে পারে। নারীকেন্দ্রিক ছবি মানে আমরা অনেক সময় যেটা ভেবে নিই যে নারীবাদী ছবি, সেক্ষেত্রে বলব এটা কিন্তু নারীবাদী ছবি নয় বরং মানবতাবাদী ছবি।

প্রশ্ন: আমি কিন্তু নারীকেন্দ্রিক ছবিই বলছি, একেবারেই নারীবাদী ছবি বলছি না…

রঞ্জন: …তাহলে তুমি ঠিক বলছ। এই ছবিতে যতটা নারীর অবদান ততটাই কিন্তু পুরুষের অবদান। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাঠামো বা রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে আমরা নারীর প্রতি যে বিদ্বেষ পোষণ করি বা যে ভাষায় সেই বিদ্বেষ প্রকাশ করি সেটা যে একমাত্র পুরুষ করে তা কিন্তু নয় সেটা একজন নারীও করে। এবং এই নারী-পুরুষ দ্বৈতভাবে আমরা যে অন্যায় করি নারীর প্রতি সেইটাই আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সেই জন্য ছবিটা সামাজিকও বটে আবার রাজনৈতিকও বটে। আর যদি জঁর হিসাবে বল, তাহলে ‘ড্রামা’ এবং কিছুটা ‘নোয়্যার’-এর ছোঁয়া আছে। কারণ, অন্ধকার রাতে লন্ঠনের আলো জ্বলছে, আগুন জ্বলছে আর তার মধ্যে একটি লং-শ্যাডো। এই ছায়া এবং ছবির মাধ্যমেই আমাদের ছায়াছবি।

প্রশ্ন: বাংলা ছবির একজন কারিগর হিসাবে বা ছবিকরিয়ে হিসাবে তুমি সবসময়ই অন্যরকম কাজ করার সাহস দেখিয়েছ। আমাদের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট দেখলে এই ছবিতে তুমি কি একটু বেশি সাহসী হয়েছ? ছবির টিজারের যে একটাই সংলাপ তা অনেক দৃঢ় এবং সাহসীও বটে। পরিচালক রঞ্জন কি এবারে একটু স্টেপ আউট করে খেললেন?

রঞ্জন: আমার প্রথম ছবি ‘হৃদমাঝারে’র ক্ষেত্রেও তুমি জানো যে আমি চেষ্টা করেছিলাম একটু অন্যভাবে ছবিটা করতে। তবে হ্যাঁ, চতুর্থ ছবিতে একটু স্টেপ আউট তো করতেই হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু তোমার প্রথম ছবির ক্ষেত্রে বলব যে, শেক্সপীয়র কিন্তু কখনোই বাঙালির ‘হোলি কাউ’ ছিলেন না।

রঞ্জন: হ্যাঁ, সেটা ঠিক। স্টেপ আউট করার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটাই বলব, সাহসী যদি নাই হলাম আর দর্শককে নতুন কিছু দিতে নাই পারলাম তাহলে আর কি হল! এবং একটা কথা বলব, কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আমি যা ফিডব্যাক পেয়েছি সেটা হ্যাবিট্যাট থিয়েটার ফেস্টিভ্যালের ২০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার কোনও ছায়াছবি স্ক্রীনিং-এর মাধ্যমেই হোক বা জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া’র মত ১০০ বছরের পুরনো ইউনিভার্সিটির প্রেক্ষাগৃহের বন্ধ দরজার পিছনে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যে ‘সিটি’ এবং করতালির মাধ্যমেই হোক, আমরা বুঝতে পেরেছি যে আমরা যেটা করার চেষ্টা করেছি তাতে খুব সামান্য হলেও হয়ত সফল হয়েছি।

প্রশ্ন: জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটিতে তোমার ছবির চিত্রনাট্য সংরক্ষিত হল। এটা যে তোমার ক্ষেত্রে প্রথমবার হয়েছে তেমনটা নয়। তোমার ‘হৃদমাঝারে’র চিত্রনাট্যও বিদেশে সংরক্ষিত হয়েছে। আমরা বলে থাকি যে, চিত্রনাট্য একটি ছবির মেরুদন্ড। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে চিত্রনাট্য তোমার শক্তিশালী দিক হওয়ার ফলে তুমি কি অনেকটা এগিয়ে থেকে ছবির কাজ শুরু করতে পার?

রঞ্জন: অবশ্যই। আমার মনে হয়, ছবিটা যদি একটি মহল হয় তবে চিত্রনাট্য হচ্ছে তার ব্লু-প্রিন্ট। ছবিটা তার উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। আর ছবির ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য এবং গল্প হচ্ছে ‘পিওর আর্ট ফর্ম’। কারণ, তখনও পর্যন্ত সেটার মধ্যে কোনও রকমের দূষণ ঢোকেনা। তারপরে আস্তে আস্তে হয়ত দূষিত হতে থাকে প্রজেক্টটা। আর চিত্রনাট্য এবং গল্প লেখাতে আমি সবথেকে বেশি সময় দিই। সেটা খুব একাকী একটা যাত্রা। কখনও মাসের-পর-মাস, কখনও বা একটা বছর লেগে যায় আমার একটি চিত্রনাট্য ফাইনালাইজ করতে। আমি কখনোই সাত দিনে, দশ দিনে বা এক মাসে চিত্রনাট্য লিখতে পারিনা। তো চিত্রনাট্য অবশ্যই ছবির সবথেকে স্ট্রং পয়েন্ট।

প্রশ্ন: তোমার চিত্রনাট্য তোমাকে কি অনেকটাই এগিয়ে থাকতে সাহায্য করে যখন তুমি শুটিং শুরু কর?

রঞ্জন: অবশ্যই এগিয়ে রাখে। কারণ, যতটা সময় আমি চিত্রনাট্যের উপরে ব্যয় করি ততটাই চরিত্রগুলো আমার কাছে খুব জীবন্ত হয়ে ওঠে। তারা কিভাবে হাঁটে, কি করে, কি না করে, কি খায়, সেটা আমার কাছে অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। সেইজন্য একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী যখন অভিনয় করেন আমি ‘ওভার ডিরেক্ট’ করি না। যেহেতু আমি চিত্রনাট্যে বেশি সময় দিই তাই তাঁদেরকে একটু ধরিয়ে দিতে বা বুঝিয়ে দিতে আমার খুব সুবিধা হয়। আর টেকনিক্যাল দিক থেকে বা শট ডিভিশন বিষয়ও অনেকটা সাহায্য হয়।

প্রশ্ন: তোমার এই ছবিতে তিনটে বড় নাম জড়িত। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় এবং পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। এর মধ্যে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত তোমার ছবিতে অভিনয় করা অভ্যাস করে ফেলেছেন, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করা খুব কষ্টকর এমনটা কেউই বলেন না। কিন্তু তোমার ওঁদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন হল, যেখানে পরমব্রত নিজে একজন পরিচালকও বটে?

রঞ্জন: অসাধারণ। ঋতু দি’র সঙ্গে তো একটা কম্ফোর্ট জোন তৈরি হয়েইছে এবং ঋতু দি’র সঙ্গে কাজ করে আমি সত্যিই খুব আরাম পাই। এত অসাধারণ এবং ইন্সটিংক্টিভ একজন অভিনেত্রী, আমার সঙ্গে তাঁর মেলবন্ধন তৃতীয় ছবিতে এসে আরও ভাল হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। কাজের যে ফলটা বেরিয়েছে সেটাও মোটামুটি ঠিকঠাক হয়েছে বলেই সবাই বলছেন। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার প্রথম ছবি আর আমি কাজ করতে করতে ওঁকে অবজার্ভ করে একজন সিনেমার ছাত্র হিসেবে অনেক কিছু শিখেছিও বটে। আর পরমব্রত একজন পরিচালক হিসাবেই হয়ত জানেন যে একজন পরিচালককে কতটা স্পেস দিতে হয়, সেই জন্য কি অমায়িক ভাবে আমার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং যেরকম যেরকম বলেছি সেই রকমই উনি করে গেছেন। এত আরাম পেয়েছি এঁদের সঙ্গে কাজ করে যে বারবার এঁদের সঙ্গে কাজ করতে আমার ইচ্ছা হয়।

প্রশ্ন: ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ এক রাতের গল্প আর এতগুলো চরিত্র। চিত্রনাট্য লেখার সময় প্রত্যেককে একটা স্পেস দেওয়াও তো কম চ্যালেঞ্জিং নয়। সেই চ্যালেঞ্জটা সামলালে কিভাবে?

রঞ্জন: এটা আমি ‘হুইসলিং উডস্ ইন্টারন্যাশনাল’ ফিল্মস্কুলে যখন চিত্রনাট্য নিয়ে স্পেশালাইজেশন করি তখনই শিখে ছিলাম এবং সেটাকেই এখন প্রয়োগ করে যাওয়া। মূল হচ্ছে লেখা এবং আবার লেখা। বারবার লিখে যেতে হবে। চরিত্র ধরে ধরে দেখে যেতে হবে যে সেই চরিত্রের গল্পটা কি বেরোচ্ছে। একদম ছোট, একটা বা দুটো সিনে যে চরিত্র থাকছে তাদের জন্যও এটা প্রযোজ্য। এটা একটা চ্যালেঞ্জ তো বটেই, এটা একটা ধৈর্যেরও খেলা। খুব ধৈর্যের সঙ্গে লিখে যাওয়া এবং নিজের কাজকে বিশ্লেষণ করে যাওয়ার জায়গাটা রাখতে হয়। আর কখনওই অল্পে সন্তুষ্ট না হওয়াটাও খুব জরুরী।

প্রশ্ন: শেষ যে কথাটা জিজ্ঞাসা করব, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনলেই বুঝি একজন অসুরের উপস্থিতি। ছবিতে সেটা হয়ত কোন একটা চরিত্র বা একটা বিষয়ও হতে পারে। কিন্তু যদি আমি আমাদের বাংলা ছবির জগতের কথা বলি, তোমার কি মনে হয় এখানে অসুর কি? একটা সময় আমরা বলতাম যে পাইরেসি ছবির জগতের অসুর, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তুমি কি বলবে?

রঞ্জন: আমার মনে হয়, আমাদের বাংলা ছবির ক্ষেত্রে অসুর হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের কনটেন্টহীনতা। আজকে আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, সেটাও তো আমাদের ভাষারই ছবি, তাঁদের কাজ দেখলে আমি ছিটকে যাই। যদি আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দিকে তাকাই যেখান থেকে চিরাচরিতভাবে ভাল ছবি এসেছে বা যেখান থেকে আগে আসেনি বর্তমানে ভাল ছবি আসা শুরু হয়েছে, আমি ছিটকে যাই। আমার মনে হয়, আমাদের বাংলাতে বা কলকাতাতে এত ভাল ট্যালেন্ট আছে, ভাল ভাল পরিচালক আছেন, লেখক আছেন, এত ভাল প্রযোজক আছেন, তাই আমাদের প্রত্যেকের মন দেওয়া উচিৎ যে আমাদের কনটেন্টহীনতা আর নতুনত্বহীনতার যে অসুর আছে তাকে বধ করে এগিয়ে যাওয়ার দিকে। এবং শুধু ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নয়, আমাদের এরকম আরও অনেক নতুন ধরণের ছবির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

Loading

Spread the love