অতনু রায়

কলকাতা, ফেব্রুয়ারি ২০: সম্প্রতি তিনি শেষ করেছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় মৃণাল সেন-এর জীবনীচিত্র ‘পদাতিক’ এর শুটিং। মৃণাল সেনের স্ত্রী গীতা সেনের চরিত্রে তাঁর লুক চমকে দিয়েছে সবাইকে। ‘পদাতিক’-এর সেটে উপস্থিত হয়ে যা বোঝা গেল, শুধু লুক নয়, অভিনয়েও চমকে দিতে চলেছেন তিনি। একান্ত আড্ডায় মনামী ঘোষ বললেন অনেক কথা।

প্রশ্ন: সেই ফ্ল্যাট, যেখানে থাকতেন মৃণাল সেন! সেই চেয়ার, টেবিল…যা ব্যবহার করতেন সেন দম্পতি, ব্যবহার করলে তুমিও! এই যে অভিনয়ের পাশাপাশি ইতিহাসকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা; অভিজ্ঞতাটা কেমন?

মনামী: ইতিহাসকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা বলতেই পারো। আমরা মৃণাল সেনের গল্প এত শুনেছি, আর আজকে তাঁর গল্পটাকে নিজের গল্প করে নিয়ে বাঁচা! একদম ব্যক্তিগত গল্প যেগুলো, সেগুলোকেও। এটা সত্যিই একটা অন্য রকমের অনুভূতি।

প্রশ্ন: তোমার অভিনয় জীবনের শুরু থেকেই তুমি মৃণাল সেনকে দেখেছো, রক্তমাংসে। যে অভিজ্ঞতাটা সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রে এই প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রায় নেই। খুব কাছ থেকে দেখা কোনো মানুষের চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে আলাদা কোনো টেনশন কাজ করে?

মনামী: এখানে একটা কথা বলব, মৃণাল সেনকে আমরা সত্যিই অনেক দিন ধরে দেখেছি। কিন্তু যেসব ছবিগুলোতে ওঁর অভিনয় রয়েছে সেগুলো ছাড়া ব্যক্তিজীবনে গীতা সেনকে আমি কিন্তু আগে সেভাবে দেখিনি। আমি যখন ছবিটা করব সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন দেখলাম যে ওঁর রিয়্যাল লাইফের খুব একটা ভিডিও কিছু নেইও। তখন আমি একটা মৃণাল সেনের ইন্টারভিউ পাই যার মধ্যে গীতা সেনেরও কিছুটা ইন্টারভিউ রয়েছে। আমার কাছে ‘রিয়্যাল লাইফ’ গীতা সেন ওইটুকুই। আর ওঁর করা চরিত্রগুলোর থেকেও তো চলা, কথা বলা খানিকটা বোঝাই যায়। আমার হোমওয়ার্ক করার জায়গা কিন্তু ওইটুকুই, খুব বেশি কিছু দেখার মত ছিলনা।

প্রশ্ন: আচ্ছা…

মনামী: সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এত বড় একটা বায়োপিক, যেখানে মৃণাল সেন-গীতা সেন তো বটেই, পাশাপাশি চরিত্রে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, এঁদের আমরা পাচ্ছি। এইরকম একটা বায়োপিকে ইনভলভ্ড হওয়ার নিজস্ব একটা টেনশন তো সবসময়ই থাকে। তা তিনি আমার নিজের চোখে দেখা মানুষ হন বা না দেখা।

প্রশ্ন: নিজেকে কি বলেছিলে শুটিং শুরুর আগে?

মনামী: আমার নিজেকে বলা বা দেওয়া চ্যালেঞ্জ এটাই ছিল যে, আমি যেন আমার তরফ থেকে ১০০০ শতাংশ দিতে পারি। যাতে আমার কোনো দিন বাড়ি ফিরে মনে না হয় যে, ওইটা অন্যরকম করলে খুব ভাল হত; ইস্! আজ ওই সিনটাতে এটা করলাম না কেন! কেন করলাম না, এই মনে হওয়াটা যেন একদিনও না থাকে। আমি যেন প্রত্যেকটা দিন নিজেকে উজাড় করে দিতে পারি।

প্রশ্ন: সেটা তো আমিও সেটে দেখলাম যে তুমি ইম্প্রোভাইজ করছ। পরিচালক ‘ওকে’ বলে দেওয়ার পরেও তুমি কোনো একটা লাইন নিজে থেকে আবার বলতে চাইছ!

মনামী: হ্যাঁ। ওই যেটা বললাম, আমার হয়ত মনে হয়েছে যে ওটা আমি আরও ভাল করে বলতে পারতাম। মানে, আমার বাড়ি গিয়ে যাতে মনে না হয় যে আমি আরও একটু দিতে পারতাম। আমি আমার পুরোটা তো দিয়ে আসি, তারপর হল না হল সেটা তো পরের ব্যাপার।

প্রশ্ন: এই যে তুমি ছোটখাটো বিষয় বলতে পারছ, করতে পারছ, তার একটা বড় কারণ হয়ত আমরা বহুদিন পরে একটা বাংলা ছবি প্রায় ২৫ দিনের কাছাকাছি শুটিং হতে দেখছি বলে! এটা সাধারণভাবে আমরা বাংলা ছবিতে পাই না। তোমার কি মনে হয়, অনেকক্ষেত্রেই শিল্পীদের কিছু খুঁতখুঁতানির জায়গা থেকে যায় যে আরেকটু সুযোগ পেলে আরো ভাল করা যেত?

মনামী: হ্যাঁ, থেকে যেতেই পারে। কিছু কিছু জায়গায় থেকে যায়ও হয়ত। সময় বা দিনের অভাবের জন্য বা তাড়াতাড়ি শিডিউল শেষ করতে হবে বলে অনেক জায়গায় হয়ত হতেও পারে কম্প্রোমাইজ। এই একটা খুঁতখুঁতানির জায়গা তো থেকে যায়ই।

প্রশ্ন: ‘মৃণাল’ চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে ‘গীতা’ মনামী ঘোষের কেমিস্ট্রি কিরকম তৈরি হল?

মনামী: চঞ্চল চৌধুরী ভীষণ মজার মানুষ। আমিও ভীষণ মজার মানুষ। ওঁর অভিনয় নিয়ে বলার তো কিছু নেই! যেটা সব থেকে বড় কথা, আমার যেটা একসঙ্গে কাজ করে মনে হয়েছে, চঞ্চল দা খুব সহজ অভিনেতা। ভাল অভিনেতা এবং সহজ অভিনেতা, এই কম্বিনেশনটা কিন্ত সব সময় পাওয়া যায়না। ওঁর সঙ্গে কাজ করা খুব সহজ। আমার সঙ্গেও যখন কেউ কাজ করে, বলে আমার সঙ্গে কাজ করাও কিন্তু খুব সহজ। সহজে কমিউনিকেট করা যায়, ওই ভারিক্কি ব্যাপারটা নেই।

প্রশ্ন: হ্যাঁ, তোমাদের দুজনেরই তথাকথিত কোনো ট্যানট্রাম নেই…

মনামী: না। ওটা নেই বলেই কাজ করাটা খুব সহজ হয়। এজন্যই আমাদের কেমিস্ট্রিটাও খুব ভাল হয়েছে।

প্রশ্ন: সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবির সেট নিয়ে প্রচুর কথা ঘুরে বেড়ায় হাওয়ায় হাওয়ায়। অনেকে বলেন, সৃজিতের সেট খুব ভয় পাওয়ার আবার অনেকে বলেন খুব মজার। তোমার কি অভিজ্ঞতা?

মনামী: (হেসে) আমারও একটুখানি ভয়ের দিকেই মতামত। তবে আমার সঙ্গে ভয়ের কিছু ঘটেনি। বরং সৃজিত দার কাছ থেকে প্রত্যেকদিন প্রশংসাই পেয়েছি। খুব ভাল হচ্ছে, ভীষণ ভাল পার্ট হচ্ছে, এগুলোই শুনেছি আর কি! হ্যাঁ, সৃজিত দা সেটে প্রচন্ড বকাবকি করেন ঠিকই। আমি অন্যান্যদের মানে টেকনিশিয়ানদেরকে বকাবকি করতেও দেখেছি। আসলে তুমি যে জায়গাটায় ভাববে যে, হয়ত এই জায়গাটা ওঁর নজর এড়িয়ে যাবে, তা হবে না। সৃজিত দা সেটের সব জায়গাটা দেখতে পায়। তাই একটু এদিক থেকে ওদিক গেলেই অনেকে হয়ত বকা খায়। আমি একদম বাধ্য ছাত্রীর মত প্রত্যেক দিন পড়াশোনা করে গেছি। মানে একেবারে ‘ফার্স্ট গার্ল’ হয়ে সেটে গেছি তো, তাই আমি হয়ত বকাটা খাইনি। তবে এখানে একটা কথা অবশ্যই বলব, তুমি যদি সেটে খুব ভাল কোন সাজেশন দাও সৃজিত দা কিন্তু সেটা নেবে।

প্রশ্ন: এমনিতেই শোনা যায় তুমি ‘চুজি’। ‘পদাতিক’ কি মনামীকে আরও ‘চুজি’ করে দেবে?

মনামী: হ্যাঁ, আমি এমনিতেই খুব ‘চুজি’ হয়ে গেছি গো! এটা যে ‘পদাতিক’-এর জন্যই, সেটা কিন্তু নয়। এখন মনে হয়, আমি শুধুমাত্র সেই সব ছবিতেই আমার এনার্জিটা দেব যেটা আমার সত্যিই ভীষণভাবে করতে ইচ্ছে করবে। মানে যে চরিত্রগুলো থেকে আমার কিছু পাওয়ার আছে এবং আমার দর্শকও কিছু পাবে।

প্রশ্ন: মানে ‘টেক অ্যাওয়ে’ ব্যাপারটা ম্যাটার করে বলছ তোমার কাছে?

মনামী: আমরা যখনই কোনো কাজ করি আমরা তো এই ভেবে করি না যে এই কাজটা অতটা ভাল নয়, সেরকম এনার্জি দেব না। সেটা তো হয় না। আমাকে আমার সমস্ত এনার্জি দিয়েই কাজ করতে হবে। আমি আর এমন কোনো কাজ করতে চাইনা যে মনে হয় যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি আমার এনার্জিটা নষ্ট করলাম। সেই এনার্জিটা আমি রাখতে চাই এমন এমন কাজের জন্য যেটা থেকে তুমি যেটা বললে যে, আমারও একটা ‘টেক অ্যাওয়ে’ থাকবে, দর্শকেরও একটা ‘টেক অ্যাওয়ে’ হবে।

প্রশ্ন: এখন প্রচুর বায়োপিক হচ্ছে। বাংলার পাশাপাশি সর্বভারতীয় স্তরেও। তুমিও তো গীতা সেনের ভূমিকায় অভিনয় করে ফেললে। একাধিক নারীকেন্দ্রিক বায়োপিকও দেখছি। এমন কোনো চরিত্র আছে, যাঁর জীবনী পড়ে বা যাঁকে চোখের সামনে দেখে মনে হয়েছে যে, ‘এই চরিত্রের বায়োপিক হলে, আমি দারুণ করতে পারতাম’?

মনামী: আমি জানিনা এটা বলাটা ঠিক হবে কিনা! আমি একেবারেই পলিটিক্যাল মানুষ নই। আমি তৃণমূলও নই, বিজেপিও নই, এটা সবাই জানে। তাই পলিটিক্যাল জায়গার সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে বলছি, ফিচার্স অনুযায়ী, চরিত্রের শেডস্ অনুযায়ী, অভিনয় করার দুর্দান্ত সুযোগের কথা যদি ভাবি, তবে আমাকে বোধহয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর চরিত্রে খুব ভাল মানাবে।

প্রশ্ন: বলছ?

মনামী: হ্যাঁ। একটা ঘটনা শোনো, একদিন ‘পদাতিক’-এর শুটিং চলছে। আমি সেদিন সেট ভিজিটে গিয়েছিলাম। আমার আর সৃজিত দার কোনো কথা হয়নি, হঠাৎ করে সৃজিত দা বলল, “মনামীর কতগুলো এক্সপ্রেশন দেখে আমার মনে হল, ওকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বায়োপিকে খুব ভাল মানাবে”।

প্রশ্ন: তোমারও মনে হয়েছে?

মনামী: আমারও মনে হয়েছে। কারণ, ওঁর মুখের আদল, চোখ, হাসি, চুল আর কিছুটা চেহারা। আর বলব, অসম্ভব অভিনয় করার ‘স্কোপ’! তুমি যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর জার্নিটা দেখো, দেখবে অসম্ভব অভিনয় করার সুযোগ রয়েছে, তাই এটা আমার মনে হয়েছে।

Loading

Spread the love