সুমন সাহা

কলকাতা, জুলাই ১৭: ‘হৃদমাঝারে’ ছবিটার বয়স আট বছর হল। এই আট বছরে বাংলা ভাষায় নির্মিত একটা ছবির গুরুত্ব আগেও যা ছিল, এখনও তাই আছে কিনা এবং আগামীতেও সেই থাকা-না থাকা কত দূর বিবর্তিত হবে, এই নিয়েই আজকের আলোচনা।

ছবি নিয়ে আলাপ-আলোচনা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ফর্ম অনুসারে করা যেতে পারে। গোটা বিশ্বজুড়ে নানা রকমের থিওরি, তর্ক, বিতর্ক থেকে জ্ঞান আহরণ করে সেই জ্ঞানের সাপেক্ষেও যেমন বিচার চালানো যায়, তেমনই নিজস্ব নান্দনিক চিন্তাভাবনা ও ছবি দেখার মেধা দিয়েও বিচার করা যেতে পারে। দ্বিতীয় পন্থায় ছবি কাটাছেঁড়া করলে বিচারে ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা অবশ্যই থেকে যায়, তবে বিচার ব্যক্তিসাপেক্ষ হওয়ার কারণে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করাও যেতে পারে।

তো, এমনই ক্ষমাকরুণ দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকিয়ে নিয়ে তারপর কী-প্যাড-এ টাইপ করা শুরু করলাম, বিষয়: রঞ্জন ঘোষের ‘হৃদমাঝারে’ এখনও কতটা প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে?

ছবিটি সম্পর্কে উইকিপিডিয়া যা বলছে, তার বাংলা করলে এমনটা দাঁড়ায়:

“গণিতের অধ্যাপক অভিজিৎ ও শিক্ষানবিশ কার্ডিওলজিস্ট দেবযানীর প্রেমের গল্প শুরু হয় এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় কলকাতার এক নির্জন রাস্তায়। এবং এটি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ারে আরেকটি বৃষ্টির সন্ধ্যায় শেষ হয়। মাঝখানে, প্রেম ও ঈর্ষা, বিশ্বাস ও বিভ্রম, নিয়তি ও মুক্ত ইচ্ছে দ্বারা বিভক্ত এক দ্বন্দ্ব-মুখর যাত্রা।

কেন্দ্রীয় থিম ‘চরিত্রই নিয়তি’। আমাদের জীবনে কী ঘটবে, তা নির্ধারিত হয়, আমরা কে তা দিয়ে। ছবিটি ‘স্ব-তাড়িত ভবিষ্যদ্বাণী’ সম্পর্কে কথা বলে, যেখানে একজন ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় এবং সে, এটি ঘটতে বাধা দেওয়ার জন্য সবকিছু করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, প্রকৃতপক্ষে এটি পূরণ করতে যায়। চলচ্চিত্রটি আমাদের সবচেয়ে লালিত স্বপ্নের অপ্রাপ্তি নিয়েও বক্তব্য রাখে”।

প্রেম
ঈর্ষা
বিশ্বাস
বিভ্রম
নিয়তি
স্বাধীন তথা মুক্ত ইচ্ছে

― ছবির শুরুতে অভিজিতের জীবন ফুরফুরে, মনে আনন্দ, কাজে অনুরক্তি, সমস্ত দিকেই সে এগিয়ে।

― হঠাৎ চায়না টাউনে এক চাইনিজ ফরচুন টেলারের সঙ্গে তার এবং তার বোন ও বোনের বয়ফ্রেন্ডের দেখা হয়ে যায়। বুড়ি জীবন ও নিয়তি নিয়ে অনেককিছু বলে। ‘ইয়ে দিল সে বচকে রেহনা, বহত জালিম খেল খেলতা হ্যায় ইয়ে দিল’। অভিজিৎ সেসময় এসব পাত্তা দেয় না।

― তারপর দেবযানীর সঙ্গে আলাপ। জীবনে আসে প্রেম।

― অভিজিৎ-এর ছাত্রী শিঞ্জিনী তাকে প্রেম নিবেদন করে, কিন্তু সে তাতে সায় দেয় না, তীব্রভাবে প্রতিবাদ করে। ছাত্রীর মনে ঈর্ষা বাসা বাঁধে। সেই ঈর্ষার কোপ পড়ে অভিজিতের ওপরে। থানায় গিয়ে শিঞ্জিনী এফআইআর দায়ের করে তার নামে। অভিজিতের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে।

― এরপর আসে বিশ্বাস। সবাই যখন ওর বিপক্ষে, তখনও সে পাশে পায় দেবযানীকে। দেবযানী পোর্ট ব্লেয়ারে জুনিয়র কার্ডিওলজিস্টের চাকরি পেয়ে যায়। কলকাতায় সবকিছু আর আগের মতো নেই বলে অভিজিৎ দেবযানীর সঙ্গে পোর্ট ব্লেয়ারে গিয়ে বাসা বাঁধে।

― পোর্ট ব্লেয়ারে দেবযানীকে নানা ভাবে সাহায্য করে তার কলেজ জীবনের বহু পুরনো বন্ধু শুভ্র। শুভ্র ও দেবযানীর ভালো বন্ধুত্বকে অন্যভাবে দেখে অভিজিৎ, জীবনে আসে বিভ্রম।

― সেই বিভ্রমই অনেকভাবে তাড়িয়ে বেড়ায় অভিজিতকে। সে ওখানকার এক কলেজে প্রফেসরের চাকরি পেলেও পড়ানোতে তার মন বসে না, সে ভাগ্য ও নিয়তি নিয়ে বইপত্র পড়া শুরু করে। চাইনিজ বুড়ির প্রফেসির কথা ভাবে, দেবযানী ও শুভ্রর মধ্যেকার সম্পর্কে অনেক শেড নিজে নিজেই যোগ করে। দেবযানীর সঙ্গে বাঁধা পড়ার পর থেকেই এসব শুরু হয়েছে, এমন একটা কুটিল ভাবনা ওর মনে জমাট বাঁধতে শুরু করে, যা যুক্তিবিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করা যায় না, অথচ অভিজিতের মনে এসব চলতে থাকে অনবরত।

― তারপর আসে নিয়তির খেলা। মান-অভিমানের পরে ফাস্ট ফুড সেন্টার থেকে বের হতে গিয়ে শুভ্র গাড়ি চাপা পড়ে। ঠিক তার আগের মুহূর্তেই দেবযানীর সংস্পর্শে এসেছিল শুভ্র, আর এর থেকে অভিজিতের মনে সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়, দেবযানী সত্যিই বুঝি ‘অপয়া’। দেবযানীর সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই সমস্ত বিপত্তি শুরু হয়েছে, এমন একটা ধারণার গোলকধাঁধায় অভিজিৎ আটকা পড়ে যায়।

― এই নিয়তির ফেরেই অভিজিৎ নিজের চাকরি আবারও খুইয়ে বসে। বিপর্যয়ের চরম সীমায় পৌঁছে যাওয়া অভিজিতের জীবনে তখন কিচ্ছু নেই, সে তখন দেবযানীর কাছ থেকে পালাতে চায়, বহুদূরে।

― সেই রাতে বৃষ্টিঘেরা মুহূর্তে তীব্র বাকবিতণ্ডা চলাকালীন অভিজিৎ ভুলবশত দেবযানীর বুকে চুল বাঁধার কাঁটা বসিয়ে দেয়। দেবযানীর মৃত্যু হয়।

এরপর রঞ্জন ঘোষ অমোঘ এক সত্য দেখান। স্ব-ইচ্ছে, মুক্ত ইচ্ছে। দেবযানী অভিজিতকে খুব ভালবাসত। দুজনের মধ্যে একান্ত আপন সম্পর্কটা দেবযানীর দিক থেকে কখনও ফুরিয়ে যায়নি। গর্ভবতী হওয়ার খবর পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছিল, ভেবেছিল অভিজিতের সঙ্গে খবরটা সেই রাতেই শেয়ার করবে। ক্যাসেটে রেকর্ড করেছিল আগত প্রাণের প্রথম হৃদস্পন্দন। সেই ক্যাসেট যত্ন নিয়ে বইয়ের ভাঁজে রেখে দিয়েছিল, যাতে বাড়ি ফিরে অভিজিৎ সেই ক্যাসেট চালিয়ে দেখে ও চমকিত হয়ে ওঠে। অভিজিতের জন্মদিনে দেবযানীর তরফ থেকে এই ছিল অমূল্য উপহার।

অভিজিৎ যদি পারিপার্শ্বিক নিয়ে এত না ভেবে নিজের ইচ্ছেতে এগিয়ে যেত, যদি মুক্ত মনে যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করত, তাহলে দেবযানীর এই পরিণতি হত না। অভিজিতেরও নিয়তি এমন করুণ দশায় এসে ঠেকত না।

এত গভীর একটা প্লটকে লেখার মাধ্যমে যতটা সহজে প্রকাশ করা যায়, ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে ধরাটা বড়ই কষ্টকর ও চিন্তাজনক। কষ্টকর – কারণ, ছবির ভাষাটা আলাদা, তাতে বলার চেয়েও দেখানোটা বেশি জরুরি, যাতে প্রচুর পরিশ্রম লাগে, প্রচুর ভাবনা লাগে, প্রচুর সাহসও লাগে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার। আর চিন্তাজনক কারণ, ফ্ল্যাটভাবে পরিবেশিত হওয়ার চরম সম্ভাবনা থাকেই। তাছাড়া পরীক্ষামূলক ট্রিটমেন্ট কতটা করা হবে, লিমিটেশন কীরকম থাকবে, সমস্ত কিছুর সঙ্গে সাযুজ্য বজায় থাকবে কিনা, সেই ভাবনাও আসে বৈকি। আর এখানেই রঞ্জন ঘোষ সফল, কেবল সফল বললে ভুল হবে, বলা চলে পূর্ণমাত্রায় সফল তিনি।

রঞ্জনবাবু কীভাবে ছবিটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, দেখুন।

১) কোনোরকম পক্ষপাতিত্ব করেননি তিনি। শিঞ্জিনীর টিন-এজ ইনফ্যাচুয়েশন যখন দেখাচ্ছেন, তখন শিঞ্জিনীর মনের সেই প্রথম উষ্ণ ভালোবাসার ছোঁয়া স্ক্রিনেও এনেছেন, শুনতে পাওয়া যাচ্ছে ‘দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা’ এবং সেই সাথে শিঞ্জিনীর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তকে ধরছেন ক্যামেরায়। এরকমভাবেই যখন অন্য চরিত্রদের দেখাচ্ছেন সে মাইনর হোক কী মেজর, সবার নিজস্ব পয়েন্ট অব্ ভিউকে সিগনিফাই যেমন করছেন রঞ্জন, তেমনিভাবে কোথাও বেশিমাত্রায় ঝুঁকেও পড়ছেন না।

২) অভিজিতের মানসিক অবস্থা যখন ক্রমশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে চলেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার জন্য রঞ্জনবাবু বিশেষ কিছু মুহূর্তকে এনেছেন। যেমন, পোর্ট ব্লেয়ারের কলেজে অভিজিতকে যখন প্রিন্সিপাল তলব করেন, তখন প্রিন্সিপালের রুমে ঢুকে এক জায়গায় কিছু মরা মাছি সে দেখতে পায়। অভিজিৎ একমনে সেই মরা মাছি প্রত্যক্ষ করতে থাকে। এর কয়েকদিন আগেই শুভ্রর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, সে দেবযানীকে সন্দেহ করা শুরু করেছে, কলেজে স্টুডেন্টরা অভিজিতের সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে পড়ানো বুঝতে পারছে না। এতরকম সমস্যায় জর্জরিত অভিজিতের মানসিক স্খলন রঞ্জন এরকমই একটি সংক্ষিপ্ত অথচ নির্দিষ্ট সলিড মুহূর্ত রচনা করার মাধ্যমে দেখান। বা ধরা যাক, বিপর্যয়ে
জীর্ণ অভিজিৎ সমুদ্রের তীরে বসে আছে, ক্যামেরা ওপর থেকে নিচে নেমে এসে অভিজিতকে পিছন থেকে ধরে। সামনে দিক-দিশাহীন সমুদ্র, একপাশে কাঁটা ঝোপ, যেন অভিজিতের মনটাকেই এভাবে দেখানো হচ্ছে। বা ধরা যাক, ছবিটি যত ক্লাইম্যাক্সের দিকে এগোতে থাকে, তত অভিজিতের গাড়ি রোজ সিগন্যালে আটকে যেতে থাকে আর সামনে রেড লাইটের কাউন্টিং দেখে ক্রমশ সে আরও চঞ্চল হয়ে উঠতে থাকে। যেন ওটা ওর নিজেরই জীবনের কাউন্টডাউন। বা ধরা যাক, রঞ্জন ঘোষ ক্যামেরায় ধরেন একটা আধো-অন্ধকারে ঢাকা টেবিল, কিছুক্ষণ আগেই অভিজিত সিগারেট খাচ্ছিল সামনে রাখা চেয়ারে বসে, এখন হয়ত উঠে পায়চারি করছে, অথচ সিগারেটের ধোঁয়া টেবিলের ওপরে বইখাতার সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। রঞ্জন এই ভেসে বেড়ানো কিলবিলে ধোঁয়াকে ক্যামেরায় ধরেন, যেন এভাবেই অভিজিতের মনের মধ্যে বাড়তে থাকা জটকে পার্সোনিফাই করা হয়। চরিত্রচিত্রণের থেকেও বড় ব্যাপার এইভাবে ভিজ্যুয়ালের সাহায্য নিয়ে চরিত্রর দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখানো, যাতে রঞ্জন ঘোষ একশো শতাংশ সফল।

৩) তিনি কোথাও নিজে থেকে কিছু চাপিয়ে দেননি। দেবযানীকে যখন অভিজিৎ সন্দেহ করছে, প্রশ্ন করছে, তখন সেই সন্দেহ ও প্রশ্নকেই ভিজ্যুয়ালি রিপ্রেজেন্ট করছেন, নিজস্ব মতামত না চাপিয়ে দিয়ে। তবে ছবির শেষে আমরা সবকিছু স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি। কী হয়েছে আর কী হতে পারত, তা নিয়ে নিরপেক্ষভাবে কিছু কথা রাখেন রঞ্জন। একদম শেষে দেবযানীর কনে-সাজ, জলের ওপরে তার ছায়া পড়েছে। আমরা সেই ছায়া দেখছি। এরকম অষ্পষ্টতার মোড়কেই দেবযানী ছবিতে এসেছিল, এক বৃষ্টিমুখর রাতে অভিজিৎ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে― প্রথমে জলে ভেজা কাচের এপাশ থেকে রাস্তায় সেই চিনে বুড়িকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছাতা মাথায়, ঠিক তার পরেই টার্ন নিয়ে দেখতে পায় দেবযানীকে, একইভাবে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে, কাচের ওপাশে অস্পষ্ট দেবযানী, রহস্যে ঢাকা।

৪) পোর্ট ব্লেয়ারে ওদের বাড়ির সামনে এক বুড়ো সকাল থেকে রাত বসে থাকে, যার একটাই দাবি― সে বেঙ্গলে ফেরত যেতে চায়। রঞ্জন ঘোষ দারুণ মুনশিয়ানায় এমন একটা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, যার সঙ্গে ছবির প্লটগত কোনো সংযোগ না থাকলেও এক অমোঘ পরিণতি কাহিনীতে এই বুড়ো চরিত্রটি ডেকে আনে। বহুকাল আগে দেশভাগের সময় আন্দামানে চলে আসা বুড়ো বাংলায় ফেরত যেতে চেয়েও পারে না। নিজস্ব চৌখুপিতে বন্দী। অভিজিতও তো তাই। নিজেরই গড়ে তোলা চক্রব্যূহতে আটকে, বের হতে পারে না।

২০১৪-তে বানানো এই ছবিতে সমসাময়িক সময়ের বেশ কিছু প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গকে রঞ্জন তুলে ধরেছিলেন। যেমন প্রফেসরের দ্বারা ফিমেল স্টুডেন্টের মলেস্টেশন ও হ্যারাসমেন্ট। এমন ঘটনা তো মাঝেমধ্যেই খবরের কাগজের পাতায় চোখে পড়ে। তবে সবই যে কাগজে লেখা বক্তব্যের মতই তরলবৎ হয়, তা তো নয়। রঞ্জন এই ধরণের অ্যাকিউজিশনের ডার্ক সাইডকে দেখিয়েছেন প্রথম ছবিতে।

শেক্সপিয়ারের ৪৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাঁকে ট্রিবিউট দেওয়া হয়েছে এই ছবির মাধ্যমে। শেক্সপিয়ারের কাজে যে চড়াই-উতরাই টের পাওয়া যায়, রঞ্জন নিজের লেখা চিত্রনাট্যেও তেমনই সব চড়াই-উতরাই রেখেছেন, অত্যন্ত যত্ন নিয়ে লেখা চিত্রনাট্যের কারণে ছবিটার ‘টোন’ কোথাও ‘ড্রপ’ করেনি। ছবির শেষে অমন চরম বিপর্যয়ের পরে শান্তভাবে তিনি দেখান এক অমোঘ সত্যকে। ট্র্যাজেডির ভার দর্শকদের পক্ষে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় তখন।

প্রথম ফিচার হওয়া সত্ত্বেও কোথাও কোনো আড়ষ্টতা সেই অর্থে এই ছবিতে নেই এবং এখানেই রঞ্জন ঘোষের পারদর্শিতা। তার থেকেও বড় কথা, ছবিটা বানানো হয়েছিল আশি লাখ টাকার বাজেটে (উইকিপিডিয়া অনুসারে)! যেখানে আজকের দিনে কয়েক কোটি বাজেট না থাকলে ছবি বানানোর পথে সচরাচর পা বাড়ান না পরিচালকরা, এই বুঝি ছবির মান পড়ে যায় এই ভেবে; সেখানে ২০১৪ সালে দাঁড়িয়ে তিনি এত কম বাজেটে এত উন্নতমানের স্মার্ট একটা ছবি দর্শকদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন! ভেবেই অবাক হয়ে যাই।

বাজেট কম হোক কি বেশি, রঞ্জন ঘোষ যে স্বল্প সংখ্যক মেটেরিয়াল দিয়েই চমৎকার সব কাজ করতে সক্ষম, তা তিনি পরবর্তী তিনটি ছবিতে প্রমাণ করে দিয়েছেন। ২০১৮ তে বানালেন ‘রং বেরঙের কড়ি’। খুব টাইট ডেডলাইনে ছবিটা শেষ করতে হয়েছিল। বাজেটও কমই ছিল। অথচ কী চমৎকার একটা ছবি! তাও তা অ্যান্থলজি। বাংলায় অ্যান্থলজি ফিল্ম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করার সাহস তখনও সেই অর্থে কেউ দেখাতে পারেননি। এখনও এই ধরণের ছবি হয় না, তবে বিদেশে বেশ প্রচলিত, হিন্দিতে বা অন্য ভাষায় হওয়া শুরু হয়েছে সম্প্রতি। রঞ্জনবাবু সাহস নিয়ে অমন ছবি করলেন। তারপর ২০১৯ এ এল ‘আহা রে…’। খাবার ও ভালবাসা নিয়ে এক জাদুবাস্তব গল্প, দুই বাংলার মেলবন্ধনের কাহিনী। চরম সাট্‌ল তিনি এই ছবিতে। ফলত পরীক্ষা চালানোর আরও পরিসর পেলেন। তারপর এই বছর বানালেন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, যাতে গত তিনটে ছবিতে নিজের গড়ে তোলা ফর্ম, স্টাইল, ব্যাকরণ পুরো ভেঙে নতুন মোড়ক ব্যবহার করলেন। সিঙ্গল লোকেশন, একটা গোটা রাত, বেশিরভাগ দৃশ্য সামান্য প্রদীপের আলোয় তোলা, স্বল্প সংখ্যক চরিত্র নিয়ে এক্সপেরিমেন্টাল সোশ্যাল থ্রিলার। স্লো-বার্ন ছবি, পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো করে পরতের পর পরত ক্রমশ খুলে যেতে থাকে, আর দর্শক চমকের পর চমক পেতে থাকে। ছবিটি এখনও মুক্তি পায়নি, এই বছর মে নাগাদ ‘নিউ ইয়র্ক ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এর ভার্চুয়াল এডিশনে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাংলা বাজারের গতে বাঁধা ফর্মুলার তোয়াক্কা না করে কী চরম সাহস বুকে নিয়ে রঞ্জন ঘোষ ছবি বানিয়ে চলেছেন, সময় নিয়ে, যত্ন সহকারে! নতুন-নতুন ফর্ম ব্যবহার করছেন, নতুন-নতুন প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ খুব শীঘ্রই থিয়েট্রিক্যাল রিলিজ হতে চলেছে, যতদূর জানি।

ফর্মুলার বাইরে বেরিয়ে বানানো ছবি বলেই হয়ত বরাবর ওঁর ছবি কম হল পেয়েছে। রাজাকার ডিস্ট্রিবিউটরদের কারসাজিতে এই ধরনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাংলা ছবি এক সপ্তাহের বেশি চলতে দেওয়া হয় না, দর্শকদের কাছে পৌঁছতে দেওয়া হয় না। যেকোনো ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাংলা ছবিকরিয়েমাত্রেই এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী। এই ২০২২-এ, এখনও বাংলা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি ধুঁকছে, লড়াই করছে, দর্শকদের কাছে পৌঁছতে চাইছে, অথচ টিকে থাকা বেজায় কঠিন, কারণ বাংলা ছবির বাজারে ছেয়ে গেছে গুচ্ছ-গুচ্ছ ঘুণপোকা, যারা নিজেদের পছন্দের প্রোডাকশন হাউজের ছবিকেই কেবল অধিকাংশ হল ও মানানসই শো টাইম দিয়ে থাকে, তা সেসব ছবি পাতে দেওয়ার যোগ্য না হলেও! তারা তাদের ভেজালে মেশানো কাজ দর্শকদের গিলিয়েই ছাড়ে শেষমেশ!

রঞ্জন ঘোষের স্বয়ংসম্পূর্ণ জার্নি শুরু হয়েছিল ‘হৃদমাঝারে’-র হাত ধরে। ছবিটা এই ২০২২-এ আট বছর পূর্ণ করল। এমন উপলক্ষ্যেই আমাদের আবার ফিরে দেখা দরকার, নতুন ভঙ্গিতে বিচার করা দরকার, প্রাসঙ্গিকতা খোঁজা দরকার। এভাবেই আমরা অর্থাৎ দর্শকরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারি। এ এক বিশাল বড় যুদ্ধ। এক অদেখা যুদ্ধ, যাতে দর্শকদের চরম ভূমিকা রয়েছে। আমরাই পারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে, জয়ের স্বাদ দিতে, রাজাকারদের বুড়ো আঙুল দেখাতে।

‘হৃদমাঝারে’ ছবিটা দেখা যাচ্ছে হইচই, ভুট, বঙ্গ বিডি এবং এমএক্স প্লেয়ারে। নিচের লিংকে দেখে নিতে পারেন ছবিটা:

Hrid Majharey Full Movie

Loading

Spread the love