অতনু রায়

কলকাতা, ডিসেম্বর ২১: অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুক্তি পেতে চলেছে ‘কারাগার ২’। সম্প্রতি কলকাতায় এসে প্রচার সেরে গেলেন সিরিজের মুখ্য অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। বাংলাদেশের বিভিন্ন কালজয়ী ছবি বা কাজে বারবার ১৯৭১ ফিরে আসতে দেখি কেন জানতে চাওয়ায় এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ‘কারাগার’-এর ‘মিস্ট্রি ম্যান’ চঞ্চল বলেন, “যদিও বা আমার জন্ম ‘৭১-এর পরে তবে আমি বাবার মুখে এবং বয়ঃজ্যেষ্ঠদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি। ‘৭১ বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের অনেক ভাল ভাল কাজ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সেই আশানুরূপ কাজ বাংলাদেশে হয়নি। হ্যাঁ, চেষ্টা করেছে অনেকে। কিন্তু, চেষ্টা করলেই তো আর হয় না। অনেক কিছু অথেন্টিক বিষয় থাকে, এর মধ্যে আবার ইতিহাস বিকৃতির ব্যাপার রয়েছে কিছু। মানে ইতিহাসটাকে পাল্টে দেওয়া আর কি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দখল এবং সেখান থেকে ইতিহাসকে ঘুরিয়ে দেওয়া বা ভুল ইতিহাসকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া, একটা অস্থিতিশীল রাজনীতি যা খুবই শঙ্কার বিষয়।”

রাষ্ট্র বাংলাদেশের সেরা অর্জন হিসেবে স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে দুই বাংলায় জনপ্রিয়তার শিখরে থাকা অভিনেতার আরও বক্তব্য, “খুব নিরপেক্ষ ভাবে যদি আমরা চিন্তা করি, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি জাতি হিসেবে আমাদের হয়নি। তার আগে ছিল আমাদের ভাষা এবং ভাষা আন্দোলন। সেটা ছিল আমাদের মায়ের ভাষার জন্য সংগ্রাম। ‘৫২ এবং ‘৭১-কে দল, মত, রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে দেখা উচিত। আমরা যদি মায়ের মুখের ভাষাটা না পেতাম, বাংলা যদি না পেতাম, স্বাধীনতা না পেতাম, তাহলে আজকে আমরা জাতি হিসেবে কোথায় থাকতাম? পরিচয়টা কোথায় থাকত? এই জায়গা থেকে প্রত্যেকের যে দায়বদ্ধতা দেশের প্রতি, ভাষার প্রতি, স্বাধীনতার প্রতি সেটা অন্তর থেকে ভালবাসার একটা বিষয় বলব না, বিষয় বললে ছোট হয়ে যায় ব্যাপারটা এটা আসলে একটা সাধনার ব্যাপার। এটা আমরা পেয়েছি অনেক সাধনা করে। সেই কারণেই ‘৭১ বারবার উঠে আসে।”

মুক্তিযুদ্ধের ছায়া তো ‘কারাগার ২’-এর ট্রেলারেও? চঞ্চলের কথায়, “ট্রেলার দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে ‘কারাগার’-এর গল্পের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের একটা সম্পর্ক আছে। ‘Black Sheep Of 1971’ বইটা দেখানো হয়েছে ‘কারাগার ২’ তে আর ট্রেলারে একটা সংলাপও আছে যেখানে আমরা শুনছি যে আমরা আসলে কি পেয়েছি, বাংলাদেশ! তাই আমরা বুঝতে পারছি যে এখানে একাত্তরের কিছু বিষয় আছে।”

তবে বারবার মুক্তিযুদ্ধে ফেরাকে কিভাবে দেখেন অভিনেতা জানতে চাওয়ায়।চঞ্চলের অকপট জবাব, “এই শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটা তো থাকা উচিত। আসলে এটাই তো আসবে, আমার পরিচয়ই তো আসবে। আমি আমার বাবার নাম, মায়ের নাম কি ভুলে যাব? আমার ইতিহাস, আমার জন্ম কোথায়, কিভাবে হয়েছে সেটা তো প্রতিদিনই একটা মানুষ বলতে পারে। তাতে তো কোনও দোষের কিছু নেই। বরং এটাই করা উচিত। আর এইভাবে স্মরণ করতে করতেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সত্যটা পৌঁছায়। আমরা যদি না বলে চুপ করে থাকি তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু জানতে পারবেনা যে আসলে সত্যটা কি।”

এর আগে সৈয়দ শাওকী পরিচালিত ‘তকদীর’ সিরিজে অভিনয় করেন চঞ্চল। তখন কি চঞ্চল বুঝেছিলেন যে তাঁর তকদীরে কারাগার বাস লেখা আছে? অভিনেতার মজার ছলে উত্তর, “না, তকদীরের সময়ে বুঝতে পারিনি যে আমার কপালে কারাবাস লেখা আছে। কিন্তু কারাগারে ঢোকার পর বুঝতে পেরেছি যে এটা আমার তকদীরে লেখা ছিল আর সেটা শাওকীর মাধ্যমে।”

নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে বেশ কয়েকটা কাজ হয়ে গেল তাঁর। যদিও বা নিজেকে ‘স্টার’ মানতে নারাজ অভিনেতা তবুও তাঁর মত ‘স্টার’-এর সঙ্গে কি ভয় নিয়ে কাজ করে নবীন প্রজন্ম? অভিনেতার বক্তব্য, “প্রথমদিকে একটু ভয়ের জায়গা হয়ত থাকে কিন্তু তারপরে আমি যখন বুঝতে পারি যে তার মেধা আছে এবং তার সঙ্গে সহযোগিতা করলে কাজটা ঠিকঠাক ভাবে করতে পারবে, আমি প্রাণপণ সহযোগিতা করি। অবশ্যই যাঁরা মেধাবী, ভাল কাজ করতে চায় বা সেই ট্যালেন্টটা আছে আমি সবসময় তাদেরকে আমার তরফ থেকে হাইয়েস্ট সাপোর্ট দি।”

এই হাইয়েস্ট সাপোর্ট প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কার জয়ী অভিনেতা আরও বলেন, “হয়ত আমার কাছে সে ৫ দিন বা ৭ দিন চাইতে ভয় পাচ্ছে যে আমি ডেট দেব কিনা। আমি ওদেরকে বলি যে তুমি আমার জন্য ৭ দিন নয়, ১০ দিন রাখো। এবার তুমি যদি ৫ দিনে কাজ করে নিতে পার তবে সমস্যা নেই, আমি বাকি ৫ দিন রেস্ট নেব; কিন্তু তুমি বেশি ডেট নিয়ে রাখ যাতে তোমার কাজের কোনও সমস্যা না হয়। এই যে মেজবাউর রহমান সুমন ‘হাওয়া’ করেছে, ও চারুকলায় আমার থেকে চার বছরের জুনিয়র। আমি ওকেও বলেছিলাম যে আমাকে তুমি কাস্ট করেছ এর জন্য তুমি প্রেসার নিও না। তোমার অন্যান্য যাঁরা আর্টিস্ট রয়েছেন, ঠিকঠাক মত কাজ কর যেটা তোমার প্রয়োজন। আমি তাঁদের সঙ্গে আমার সর্বোচ্চ লেভেলে গিয়ে অ্যাডজাস্ট করে নেব। এটা শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, ক্যামেরার পেছনেও আমরা যতক্ষণ থাকি তোমার সাথে, তুমি সেই পরিবেশটাই পাবে। শুধু তোমার ক্রিয়েটিভ কাজটা তুমি মনোযোগ দিয়ে করো।”

২২ ডিসেম্বর ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই’তে মুক্তি পেতে চলেছে সৈয়দ শাওকী পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘কারাগার’ এর ২য় সিজন্। এর আগে ‘কারাগার’ প্রথম সিজন অভাবনীয় সাফল্য পায় এবং দর্শকেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্বিতীয় সিজন এর জন্য তাঁদের অপেক্ষার জানান দেন। প্রসঙ্গত, প্রথমে ঠিক হয়েছিল ১৫ ডিসেম্বর মুক্তি পাবে সিরিজটি কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের কথা মাথায় রেখে দিন বদল করা হয়।

Loading

Spread the love