অতনু রায়

কলকাতা, সেপ্টেম্বর ৩০: তিনি এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা অভিনেতা। ‘মনপুরা’, ‘মনের মানুষ’, ‘আয়নাবাজি’ থেকে হালের ‘হাওয়া’ তাঁর উপস্থিতি সবসময়ই দিয়েছে চমক। মোবাইল স্ক্রিনেও তাঁর অবাধ যাতায়াতে তৈরি হয় ‘কারাগার’, ‘তাকদীর’ বা ‘মুন্সিগিরি’র মত শিল্প। দু’বার বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী এই অভিনেতা এসেছিলেন কলকাতায়। কলকাতায় প্রযোজনা সংস্থা এসভিএফ-এর অফিসে মন খুলে আড্ডা দিলেন অভিনেতা তথা গায়ক-চিত্রশিল্পী চঞ্চল চৌধুরী

প্রশ্ন: সুচিন্ত চৌধুরী। পৃথিবীর কাছে চঞ্চল। আমি বলব অচিন্ত্য…

চঞ্চল: … (হেসে) অচিন্ত্য কিন্তু আমার এক ভাইয়ের নাম। আমার মেজদার নাম হচ্ছে অচিন্ত্য।

প্রশ্ন: আচ্ছা। আপনার সাফল্য অচিন্তনীয়। উপমহাদেশের অন্যতম সেরা অভিনেতা আপনি। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক দূরত্ব আরও অনেকটা কমিয়ে দিয়েছেন এক ঝটকায়। আজ এই বাংলাতেও অনেকেই চঞ্চল চৌধুরীর কাজ দেখবেন বলে অপেক্ষা করেন। এই জার্নিটা নিয়ে যদি কিছু বলেন…

চঞ্চল: এটা যে আসলে আমি একা করি, তা নয়। আমি একটা কথা খুব বড় করে বলতে চাই এবং বিশ্বাস করি মন থেকে যে শিল্পের শক্তিটা আসলে অসীম। যে কাজটি ধর্ম পারেনা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলাদলির কারণে করা হয়না,  শিল্প সেই কাজটি করতে পারে। সমস্ত মানুষকে একটা প্ল্যাটফর্মে এনে একই ভাবনার মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার কাজটা করতে একটা ভাল গান পারে, একটা ছবি পারে, সিনেমা পারে। সেই জায়গা থেকে আমরা কে কোন বাংলার সেটা কোনও ব্যাপার না, পৃথিবীর কোন প্রান্তের মানুষ সেটাও কোনও ব্যাপার না। যে শিল্পের জন্য আমাদের সাধনা অথবা যে কাজটি আমরা করছি বা দীর্ঘদিন ধরে করার চেষ্টা করছি সেই কাজের ফলাফল হচ্ছে যখন আমরা ভাল কিছু করে ফেলি তখন সেই কাজটা করে সব মানুষকে এক জায়গায় আনতে পারি।  সব মানুষ এসে আমাদের কাজ দেখেন এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে আমাদের শিল্পের জায়গাটা কিন্তু তখন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আপনি যেটা বললেন, শিল্পই সেটা পারে। দুই বাংলাকে এক করতে পারে কিন্তু আমাদের এই কাজগুলো। একটা ‘হাওয়া’, একটা ‘কারাগার’ যেটা এখন হইচই-তে চলছে  সেটা দুই বাংলার মানুষ দেখছেন এবং ভাললাগা প্রকাশ করছেন। এইজন্য আমি কাজ করি সেই সব পরিচালক, সহঅভিনেতা এবং টিমের সঙ্গে যাতে কাজগুলো সেই মানের হয়ে ওঠে। সবগুলোই তো সেই মানের হয়ে ওঠেনা, কারণ অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কিছুই ইচ্ছে থাকলেও অনেক সময় সম্ভব হয়না। কিন্তু যে কাজগুলো হয়, সেই কাজগুলোর পিছনে অনেকগুলো মানুষের সৎ ভাবনাটা আছে, এই জন্যই হয়ত আমরা দুই বাংলার মানুষ একসঙ্গে কিছু কাজ দেখতে পারি।

প্রশ্ন: চঞ্চল চৌধুরী মানুষটার কথা আমি জিজ্ঞাসা করছি না। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর মধ্যে সত্যিই কী কোনও চঞ্চলতা আছে?

চঞ্চল: সেটা তো অবশ্যই আছে। অভিনেতা বলি বা যাই বলি, অভিনয় করার চেষ্টা করি। সেই চঞ্চলতাটা বাইরে কতটুকু আছে সেটা আমি জানি না, তবে ভিতরে ভিতরে তো চঞ্চলতা অবশ্যই আছে। কোনও কাজ যখন দর্শকদের খুব ভাল লাগে, দর্শক যখন বলেন ‘আপনার এই কাজটা দেখলাম খুব ভাল লাগল’, তখন তো নিজের ভিতরটা চঞ্চল হয়, সে ভাল লাগার চঞ্চলতা। এছাড়া ছোটবেলা থেকে হয়ত একটু দুষ্টু ছিলাম সে কারণেই আমার নামটা হয়ত চঞ্চল। ছোট ছিলাম আমি তো জানিনা, হয়তো আমার চঞ্চলতা দেখেই বাড়ি থেকে নামটা রাখা হয়েছে। তবে চঞ্চলতা আছে। আসলে চঞ্চল ছাড়া কি কিছু চলে?

প্রশ্ন: একেবারেই না…

চঞ্চল: কেউ যদি স্থির হয়ে যায় তাহলে সে এগোবে কিভাবে? তাকে তাহলে এক জায়গায় বসে থাকতে হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু চঞ্চল চৌধুরীর ক্ষেত্রে সাফল্যটা স্থির। এটা একটা ‘কনস্ট্যান্ট’ যে, চঞ্চল চৌধুরী কোনও কাজে থাকা মানে সেই কাজ সফল হবেই।

চঞ্চল: (হাসি) সেটা কতটুকু হয়, না হয় সেটা জানিনা। কিন্তু যখন সফল হয়, তখন কিন্তু ওই সফলতা নিয়ে আমি আবার স্থির হয়ে যাই না। চেষ্টা করি যাতে আমার চঞ্চলতাটা চলতে থাকে।

প্রশ্ন: আজকে কলকাতায় বসে আমার মত হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষায় আছেন যে কবে তারা ‘হাওয়া’ দেখতে পাবেন। আপনার কাজ না দেখতে পাওয়া পর্যন্ত এই যে অধীর আগ্রহ, এ তো অভিনেতা চঞ্চলের অর্জন?

চঞ্চল: এটা আমি আমার সৌভাগ্য মনে করি।

প্রশ্ন: এই অর্জন তো এমনি এমনি হয় না। এই অর্জনের পিছনে কি কি ত্যাগ আছে?

চঞ্চল: ত্যাগ বলতে গেলে আসলে বলব, যে কোনও কাজ করতে গেলেই তো নিজের স্বার্থের কথাটা বাদ দিয়ে কাজের কথাটা আগে মাথায় রাখতে হয়। সেটা যে শুধু অভিনয়ের ক্ষেত্রে সেটা নয়, অনেক এরকম পেশা আছে। সেটা যদি আমি ডাক্তারদের কথা বলি, মানবিক একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে যে কাজটা তাঁরা করেন, মানুষের জন্য যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁরাই তো সমাজের সবথেকে উপকারী মানুষ হিসেবে পরিচিত হন। শিক্ষকতার কথাই যদি বলি, এসব তো আসলে মানুষের কল্যাণের জন্য করা, মানুষের সুস্থতার জন্য করা। শারীরিক সুস্থতার জন্য, মানসিক সুস্থতার জন্য। এই কাজগুলো যাঁরা করেন, সবার প্রতি আমি আমার শ্রদ্ধা জানাতে চাই। আমি যে কাজটা করছি, সেটা করতে গিয়ে স্ট্রাগলটা করতে হয়েছে ছোটবেলা থেকেই। প্রথমদিকের  স্ট্রাগলটা ছিল বেঁচে থাকার। পড়াশোনা করব, নিজের জীবনে কিভাবে সফল হব বা দাঁড়ানোর জায়গা পাব সেই যুদ্ধটা ছিল আর তার সাথে নিজের টিকে থাকার যুদ্ধ। তারপর নিজের শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা, সেটাও তো একটা সময় ভিতরে থাকে তারপর মুখে মুখে চলে আসে।  এটাও একটা স্ট্রাগল যে আমি একটা কিছু পেলাম, তারপর আমি মনে করতেই পারি যে আমার জীবনে যতটুকু অ্যাচিভমেন্ট হয়েছে এরপরে বোধহয় আমি আর অতটা স্যাক্রিফাইস না করে নিজের স্বার্থটা নিজে বুঝে নিতে পারলেই ভাল থাকব। সেই জায়গাটা তো আমি আসলে চিন্তা করছি না, আমি চিন্তা করছি যে কষ্ট করে হলেও যে কাজগুলো করেছি বা যে কাজগুলোর জন্য দর্শক আমাকে ভালবেসেছেন, তাঁদের এই ভালবাসার জন্য সম্মান জানানোটা আমার আমৃত্যু যেন থাকে। এটা কিন্তু দায়বদ্ধতা। শিল্পের প্রতি যেমন দায়বদ্ধতা থাকে, এই মানুষগুলোর প্রতিও কিন্তু আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। যাঁরা আমাকে বিশ্বাস করেন, তাঁদের আমার কাজের প্রতি যে আস্থা তৈরি হয়েছে সেটা যেন কোনভাবেই ভেঙে না যায়।

প্রশ্ন: অনেক বিদগ্ধ অভিনেতা বলে থাকেন, মঞ্চ একজন অভিনেতাকে লালন করে। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর উত্তরণে মঞ্চ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে?

চঞ্চল: আমি মনে করি আমার অভিনেতা হয়ে বেড়ে ওঠাটা কেউ যদি স্বীকার করেন, সেটার পিছনে সবথেকে বড় গুরুত্ব রয়েছে মঞ্চের। মঞ্চ থেকেই আমার অভিনয়ে হাতে খড়ি, আমার শেখা। তার পরে মাধ্যম অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সেই শিক্ষাটাকে আমি অন্য মাধ্যমের উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করেছি। মঞ্চের কাজের একটা ধরণ আছে, ২০০-৫০০ দর্শকের সামনে অভিনয় করা। অভিনয়ের মূলসূত্রটা তো এক। কিভাবে অভিনেতা হয়ে উঠতে হয় বা কিভাবে চরিত্র নির্মাণ করতে হয় সেই ফর্মুলাটা তো আসলে কমন। এবারে আমি যখন টেলিভিশনে অথবা সিনেমায় অভিনয় করছি তখন সেই জায়গার টেকনিক্যাল বিষয়টা মাথায় রেখে অভিনয় করছি। কিন্তু সূত্রটা তো একই। সেই সূত্রটিই আমার শেখা মঞ্চ থেকে। তাই মঞ্চের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা সবথেকে বেশি। আর মঞ্চের পাশাপাশি যে ব্যাপারটা আমাকে সব থেকে বেশি সাপোর্ট দিয়েছে সেটা আমার চারুকলা নিয়ে পড়াশোনাটা। আমার ইম্যাজিনেশন পাওয়ার চারুকলার শিক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছে…

প্রশ্ন: …আমার প্রশ্নের মধ্যে এটা ছিলও। আপনি এত সুন্দর ছবি আঁকেন। ছবি চিত্রশিল্পীর নির্বাক অভিব্যক্তি। অভিনয়, সেও এক অভিব্যক্তি, পর্দায় ছবি আঁকা। আঁকিয়ের মন অভিনেতা চঞ্চলের সহযোগিতা করে কখনও?

চঞ্চল: একদম। আমি আগে হয়ত দেখতাম না সেইভাবে আর দেখার সুযোগও ছিল না। যখন সিনেমা, বিজ্ঞাপন ৩৫এমএম-এ শুট হত, তখন তো এক শট্ দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ হত না, তখন একটা শট্ দিলাম, পরিচালক ‘ওকে’ বলতেন তো ‘ওকে’ আর ‘এনজি’ বললে আরেকবার হয়তো টেক দিতে হত। আর এখন যতক্ষণ পর্যন্ত অভিনেতা বা পরিচালক সন্তুষ্ট না হন ততক্ষণ কিন্তু সেই শটটা দিতে হয়।

প্রশ্ন: ডিজিট্যাল মাধ্যমে যেটা হয়…

চঞ্চল: …হ্যাঁ, ডিজিট্যাল মাধ্যমের যে সুবিধাটা। সেটা কিন্তু আমি দেখি একটা শট দেওয়ার পরে যে আমি ভিতরে যেটা ফিল করলাম, আমার এক্সপ্রেশনে সেটাই এল কিনা বা আমার পরিচালক সেটাকে আসলেই কতটুকু গ্রহণ করলেন। বা পরিচালক হয়ত বললেন যে, ‘হ্যাঁ হয়েছে, ঠিক আছে’। কিন্তু ওই ‘ঠিক আছে’ টার সঙ্গে আমি একমত হই না। পরিচালক যেন খুব কনফিডেন্টলি বলেন যে, হ্যাঁ! ঠিক আছে। তখন আমি অন্য একটা শটে যাই এবং আমি দেখি। আমি রিক্যুয়েস্ট করি তাদেরকে, এজন্য আমার অনেক সহ অভিনেতা বলেন যে, ‘তুমি কেন তোমার শটকে বারবার টেনে টেনে দেখো কেন?’ আমি বলি যে, আমার ভুল ধরবার জন্য। আমি আমার কাজ যখন স্ক্রিনে দেখি তখনও প্রথম দেখাটা থাকে একদমই আমার ভুল বা ঐ কাজের কোথাও কোনও গ্যাপ আছে কিনা ধরার জন্য। আমি আমার নিজের বিবেচনায় যতটুকু বুঝি আর কি। এবার আমার যদি কাজটা দেখে মনে হয় যে হ্যাঁ, ৮০-৯০ শতাংশ ঠিক আছে তারপরে আমি দর্শকের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করি। প্রথমবার আমি দর্শকের দৃষ্টিতে দেখি না, আমার কাজ বিশেষ করে। অন্যের কাজ যখন দেখতে যাই তখন আমি দর্শকের মতই দেখি।

প্রশ্ন: এখানে তার মানে আপনার একটা আত্মসমীক্ষার ব্যাপার থাকে?

চঞ্চল: হ্যাঁ, আত্মসমীক্ষার একটা ব্যাপার আছে আমার।
যেমন, ‘কারাগার’ যেদিন প্রথম হইচই-তে এল সেদিন রাতেই আমি সবগুলো পর্ব দেখেছি। আমি আমার এক পারিবারিক বন্ধুর বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছিলাম, সেখানেই প্রায় ৭-৮ জন মিলে একসঙ্গে আমরা ‘কারাগার’ দেখলাম।  ওই দেখাটাতে আমি অনেক জায়গা মিস করলাম, ঠিকমত দেখতে পারিনি। তারপর বাড়িতে একদিন আবার ক্রিটিক্যালি দেখার চেষ্টা করলাম। চারপাশে দর্শকের রেসপন্স যেটুকু দেখেছি সবাই ভাল বলছেন। কেন ভাল বলছেন? কেন তাদের ভাল লাগল? কাজটা আসলেই এত ভাল হয়েছে কিনা বা এতটা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য কিনা কাজটা বা আমি, সেটা তো দর্শক হিসেবেও আমাকে একটু যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। তারপর শেষ বার এই কলকাতায় আসবার আগে একদিন আমার ছেলে এবং বউ ঘুমিয়ে পড়ল তখন আমি ভাবলাম যে, আজকে আমি ‘কারাগার’টা দেখব। তারপর প্রথম এপিসোড থেকে শেষ এপিসোড পর্যন্ত দর্শকের জায়গা থেকে আমি কাজটা দেখলাম।

প্রশ্ন: কিন্তু যত সহজে আপনি বললেন, একবার আত্মসমীক্ষা হিসাবে একবার দর্শক হিসাবে, একজন অভিনেতার কি কাজটা অতটাও সোজা হয়? এই শিফটিংটার জন্য তো একটা আলাদা রকমের অধ্যাবসায়ের প্রয়োজন হয়!

চঞ্চল: এটা খুব কঠিন কাজ। কারণ, আমরা সবসময়ই একটা আত্মতৃপ্তিতে ভুগি তো। নিজের সবকিছুই আমরা মনে করি যে আমি যেটা করছি সেটা ঠিক।

প্রশ্ন: একদমই। সেটা তো থাকেই…

চঞ্চল: …আগে যখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, নিজের বিচার নিজেই করতাম, নিজের ডিসিশন নিজেই নিতাম। কিন্তু এখন তো যেকোনো কাজ করলে একটু খারাপ হলে সেটা তো ভীষণ খারাপ হয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। আবার একটু ভাল কেউ করলে পরে অনেক ভাল হিসেবে দর্শক সেটাই প্রকাশ করে। এটার একটা যন্ত্রণাও আছে। এটা সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আরও বেশি হয়েছে। কিন্তু যখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিলনা তখন যে ভঙ্গিতে এবং যে মানসিকতায় আমি নিজের কাজ দেখতাম, এখনও সেই ভঙ্গিতেই দেখি। আত্মতৃপ্তিতে আমি ডুবে যাই না কখনও।

প্রশ্ন: মানে ওই মাইন্ডসেট যেটা আপনার আগে থেকে তৈরি হয়েছে, সেটা এখনও আছে?

চঞ্চল: এটা রাখা খুব কঠিন। পক্ষপাত তো একটা ব্যাপার, তাই না? কারণ, আমি যখন আমার কাজ দেখব তখনও অটোমেটিক্যালি কিন্তু নিজের কাজের প্রতি একটা পক্ষপাতিত্ব চলে আসে। ওই জায়গা থেকে আবার একটু শিফট্ করি। এরকমও হয়েছে, যখন মনে হচ্ছে যে আমার কাজ তখন আবার একটু সরে এসে আগে থেকে দেখেছি। এটা হচ্ছে এক ধরণের পাগলামো।

প্রশ্ন: এটা খুব ইউনিক একটা প্র্যাক্টিসও বটে। আপনার আগে আমি অন্য কোনও অভিনেতার কাছে এই কথাগুলো কখনও শুনিনি। কিন্তু সেই সময় কি একটা বাংলা কাজের ক্ষেত্রে আপনি পান? কলকাতায় অনেক অভিনেতা এবং পরিচালকের একটা ক্ষোভের জায়গা রয়েছে যে খুব কম দিনে তাঁদেরকে ছবি বানাতে হয়। সে ক্ষেত্রে আপনার যে খুঁতখুঁতানি সেইটাকে কি পরিচালক এবং প্রযোজক সম্মান দেখাতে পারেন?

চঞ্চল: এই সমস্যাটা বাংলাদেশেও অবশ্যই আছে এবং এখানকার থেকে অনেক বেশি আছে। কারণ, কলকাতা তো টেকনিক্যালি এবং প্রফেশনালি অনেক এগিয়ে যাওয়া একটা ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের ওখানে তো নানা কারণে, সেটা রাজনৈতিক কারণেই হোক বা নানা ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাজগুলো পিছিয়ে পড়ে, আবার একটু এগোয়। সেই জায়গা থেকে আমাদের কিছু আলাদা মানসিক প্রস্তুতি থাকে একটা কাজ করবার জন্য। আর এই যে তাড়াহুড়ো করে কাজ করার কথা যেটা বলা হল, আমি তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে পারিনা। একদমই পারি না। কারণ, আমি যে প্রজেক্টেই কাজ করি, সেটা কোনও সিনেমা হোক বা ইদানিং যে ওয়েব সিরিজ, সেই কাজ নিয়ে আমার ভাবনা চিন্তার জন্য কমপক্ষে ১-২ মাস সময় লাগে। পরিচালকেরা ফোন করছেন, আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমাকে হয়ত তাঁরা স্ক্রিপ্ট দিয়েছেন কিন্তু ১৫ দিন হয়ে গেছে আমি স্ক্রিপ্টটা পড়ার সুযোগ পাইনি। আবার হয়তো ফোন করছেন আমি স্ক্রিপ্টে পড়ছি কিনা জানতে। আমি হাতজোড় করে বলি যে, একটা স্ক্রিপ্ট পড়তে বসব, তার জন্যও আমার একটা মানসিক প্রস্তুতি দরকার। ব্যাপারটা এরকম নয় যে কালকেই আমাকে জানাতে হবে যে কাজটা করব কি করব না তাই আজকে শুটিং শেষে এসে আমি ধুমধুম করে রাতেই স্ক্রিপ্টটা পড়ে ফেললাম।  সেটা সম্ভব নয়। আমার পড়ার মধ্যে সেই মানসিক জায়গাটা থাকা দরকার, যাতে আমি সেই সঠিক বিচারটা করতে পারি যে এই কাজটি আমি করব কিনা বা করা উচিত হবে কিনা বা গল্পটি ঠিকঠাক আছে কিনা। সেটা আমার বিচারটা তো আমি নিজে করব। আমার কাজের বিচার, তারপরে আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাব। সেটার জন্য একটা সময়ের দরকার।

প্রশ্ন: আর বাজেট?

চঞ্চল: স্বল্প বাজেটের জন্য অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে কাজটা করতে হয়, আমি সেই কাজটাও পারি না। সে ক্ষেত্রে কি করতে হয়, আমার উপর যে প্রেসার থাকে সেই প্রেসার থেকে আমি আমার পরিচালককে রিলিজ করে দিই। আমি বলি, আমাকে নিয়ে তুমি ভেবো না, তুমি তোমার কাজটা ঠিকঠাক কর। তোমাকে যদি ২ দিনের জায়গায় ৫ দিন ডেট দিতে হয় আমি তোমাকে দেব কিন্তু কাজটা আমি প্রপারলি দেখতে চাই। সেক্ষেত্রে আমাকে ছাড় দিতে হয় অনেকটা। সেটা অর্থনৈতিকভাবে হোক বা সময়ের ক্ষেত্রে হোক এবং সেটা দিতে দিতে দেখা যায় যে কাজটা আমরা ফাইন্যালি দেখছি ‘কারাগার’ অথবা ‘হাওয়া’ সেটা যখন পর্দায় চলে আসে তখন তার পিছনের এই ইতিহাসগুলো কিন্তু আর কেউ জানতে পারেনা যে, কাজের পিছনে যতটুকু বরাদ্দ ছিল সেটা বাজেটের কথা বলি বা সময় আসলেই সেটা সেই বাজেটে বা সময়ে সম্ভব হয়েছে কিনা! বা বাড়তি যে যোগানটি লাগল, সেই যোগান কারা দিল? সেই স্যাক্রিফাইসগুলো যাঁরা করে তাদের সঙ্গেই আমি কাজ করি। একজন পরিচালক, তাঁর চিন্তা থাকবে যে তুমি এখান থেকে কিছু এক্সপেক্ট করবে না, আমিও করব না। এরকম যে কাজগুলো দর্শকদের কাছে সেভাবে পৌঁছেছে আর ভাল লেগেছে, সেই প্রত্যেকটা কাজের পিছনের ইতিহাস কিন্তু এক।

প্রশ্ন: অসম্ভব ভাল কথা বললেন চঞ্চল দা। এই কারণেই কি আপনার ফিল্মোগ্রাফিতে সিনেমার সংখ্যাটা খুব কম?

চঞ্চল: একদমই তাই

প্রশ্ন: ওটিটি আসার পরে আমরা বলে থাকি, কনটেন্ট ইজ দ্য কিং। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপনি কি শুধু কনটেন্টটাই দেখেন না সেই পরিচালকের সঙ্গে আপনার কমফোর্টেবল জোনটাও? কি ভাবেন আপনি?

চঞ্চল:  কয়েকটা বিষয় তো দেখতেই হয়। কন্টেন্ট তো দেখতেই হবে। আমি ২০২২ সালে কোন গল্পে কাজ করব, কোন চরিত্রে কাজ করব সেটা যেমন যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে আছে তেমনই কোন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করব সেটাও দেখতে হবে। আমাকে কোটি কোটি টাকা দিলেও আমি একজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করব না আবার একজন পরিচালকের সঙ্গে আমার যদি মনে হয় কাজ করা উচিত তাহলে আমার সর্বস্ব বিকিয়ে দিয়ে হলেও আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করব। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোও আমার মাথায় থাকে যে আমার সহশিল্পী কারা, গল্পটা ঠিকঠাক লেখা হয়েছে কিনা, চরিত্রটা আছে কিনা মানে যেখানে ঠিকঠাকভাবে কোন এফর্ট দিলে আমি তার থেকে একটা রেজাল্ট পাব বা আমার যিনি নির্মাতা তিনি সৎ ভাবে কাজটা করতে চাইছেন কিনা। আমরা তো মনে করি শিল্পী মানেই বোধহয় অন্য গ্রহের মানুষ, কিন্তু ব্যাপারটা তো তা নয়। শিল্পীর মধ্যেও তো ভাল মন্দ আছে। এটা একটা পদবী হয়ে গেছে। একটা সময় ছিল যে শিল্পী মানে তাঁর একটা আলাদা রকমের চিন্তা-ভাবনা, দর্শন থাকে…

প্রশ্ন: …একটা বর্মও থাকত

চঞ্চল: … হ্যাঁ, বর্ম থাকত, আর শিল্পের সঙ্গেই সে সবসময় থাকত। এখন শিল্পটা যখন বাণিজ্য হিসেবে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে তখন শিল্পীও কিন্তু একজন ব্যবসায়ী হয়ে যাচ্ছে অনেক সময়। অনেক নির্মাতা ব্যবসায়ী হয়ে যাচ্ছেন আর এই ব্যবসায়ী হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নিজের ভিতরের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কিন্তু খুব কঠিন একটা কাজ।

প্রশ্ন: আমার ‘হাওয়া’ ট্রেলারে চান মাঝি বা তাকদীর দেখে মনে হচ্ছিল একটা কথা। দেখুন, শ্রমিক আমরা সবাই। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমিও শ্রমিক, একজন শিল্পীও শ্রমিক। কেউ হয়ত কমেডি অভিনয়ে খুব ভাল, কেউ রোম্যান্টিক হিরো, কেউ সিরিয়াস চরিত্রে ভাল। কিন্তু শ্রমিক থেকে প্রেমিকের রেঞ্জে একই ধরণের বিরল ম্যাজিক তৈরি করেন চঞ্চল চৌধুরী। এই ম্যাজিকের রেসিপি কি?

চঞ্চল: এটার আলাদা কোনও রেসিপি নেই। এটা হচ্ছে, আমি আসলে নিজেকে কি ভাবে দেখতে চাই। এটা প্রথমে একজন অভিনেতার নিজের ডিসিশন যে আমি কি ধরণের চরিত্রে নিজেকে দেখব। আমি কি নিজের বাইরে নিজেই একটা গণ্ডি তৈরি করে ফেলব যে আমি একজন কমেডি অভিনেতা বা আমি একজন সিরিয়াস অভিনেতা বা আমি একজন রোম্যান্টিক হিরো বা নেগেটিভ ক্যারেক্টার করি! এটা যার যার নিজস্ব ব্যাপার। আমি যদি মনে করি যে, আমি একজন কমপ্লিট অভিনেতা হতে চাই, কোনও চরিত্রেই আমার কোনও বাধা থাকবে না বা কোনও একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে আমি পরিচিত হব না, আমার পরিচয় একটাই থাকবে যে আমি একজন অভিনেতা তাহলে বোধহয় এই ঝামেলাগুলো থাকেনা। অনেকেই আবার ওই পদবীগুলো পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাচ্ছেন, যে কারণে তিনি একই বই বারবার পড়ছেন। কিন্তু আমি যদি বলি, একটা বই আমার পড়া হয়ে গেছে তাই ওই বইটি আমি না পড়লেও চলবে, আমি নতুন বই পড়ব, নতুন কিছু করব। নিজের সঙ্গে নিজের একটা যুদ্ধ, সেটা খুব সহজ কাজ নয়। নিজেকে ভাঙ্গার চেষ্টাটা আমি করি। কখনও কিছু একটা হয়, কখনো হয়না, বেশিরভাগ সময়েই হয় না কিন্তু চেষ্টা করি। আর এই কারণেই হয়ত আপনি যেটা বললেন যে প্রেমিক থেকে শ্রমিক সেটা হয়। আর একটা কথা তো একেবারেই সত্যি। সেটা হচ্ছে, আমার শরীরে তো প্রেমিকের রক্ত নয়, আমার শরীরে আসলে শ্রমিকের রক্ত। আমি রিপ্রেজেন্ট করি আমার সোসাইটির যাঁদের, তাঁরা তো উচ্চশ্রেণীর বিশাল সুবিধাবাদী মানুষ নয়!

প্রশ্ন: একদমই।

চঞ্চল: এই বিশাল সুবিধাবাধী মানুষের যে চরিত্র বা তাঁর যে জীবনযাপন ওইটা আমাকে টানে না। আমি নিজেকে বিলীন করতে পারি আমাদের খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে। তাই একজন ট্রাক ড্রাইভার, একজন ফ্রিজার ভ্যান ড্রাইভার বা একজন মাঝির যে জীবনযাপন, যে স্ট্রাগল ওই চরিত্রগুলোই আমার রক্তে আছে আর আমার দেখা চরিত্র বা আমি ফিল করতে পারি। খুব সহজে কানেক্ট করতেও পারি। আমাকে এমন কোনও চরিত্রে বসিয়ে দেওয়া হল যে চরিত্র সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই নেই, আমি যেতে পারব না ওই জায়গায়। আমি করতেও চাইনা। এখনও যাঁদের রক্ত এবং ঘামে এই সমাজটা, দেশটা টিকে আছে ওই মানুষগুলোরই আমি প্রতিনিধি।

প্রশ্ন: সেটা তো বুঝলাম যে আপনার শরীর শ্রমিকের রক্ত। আমাদের প্রত্যেকের শরীরেই তাই। কিন্তু মানুষ চঞ্চল চৌধুরী প্রেমিক হিসেবে কেমন?

চঞ্চল: আমি প্রেমিক হিসাবে ভাল বলব। আমার প্রেমটা কোনও ব্যক্তি বিশেষ বা কোনও প্রেমিকার প্রতি প্রেম নয়, এই প্রেমটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ যে প্রেমটা আমার দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি, ফ্যামিলির প্রতি, আমার দর্শকের প্রতি এবং সর্বোপরি আমি যে কাজটা করি সেই কাজের প্রতি থাকতে হবে। সেই জায়গা থেকে যদি বলি, তাহলে বলব যে আমি আসলে একজন ওই প্রেমিকই।

প্রশ্ন: আদ্যন্ত প্রেমিক মানুষ একজন।

চঞ্চল: আমি যেটা বললাম যে প্রেমিক হতে চাইনা আমি শ্রমিক হতে চাই, আমি আসলে তথাকথিত যে প্রেমিক সেই প্রেমিক নয়, আমি ওই প্রেমিক।

প্রশ্ন: শ্রমের প্রতি প্রেমটা আছে।

চঞ্চল: অবশ্যই (হাসি)।

প্রশ্ন: আপনি খুব ভাল গান করেন। আপনি যখন কোনও গান উপস্থাপন করেন একটা অদ্ভুত রকমের সারল্য থাকে যেটা আপনার চোখেমুখে প্রকাশ পায় এবং একটা অভিনয় লুকিয়ে থাকে। আমরা সাধারণত দেখি যে, সাফল্য এবং সারল্যের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। সাফল্য এবং সারল্য একইসঙ্গে খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

চঞ্চল: হ্যাঁ হ্যাঁ, থাকেনা।

প্রশ্ন: তাহলে চঞ্চল চৌধুরী কিভাবে এটাকে ধরে রাখেন?

চঞ্চল: (হাসি) এই ধরাধরির আসলে কোনও সূত্র নেই। একজন মানুষ যা কিছু করে, এইযে আমরা বলি অভিনয়, এই অভিনয়টা কি আমরা বিশ্বাস করি? আমার স্ত্রী বা সন্তান বা আমার বাবা-মা কোন কথাটা বলছে, তাঁরা যদি অভিনয় করে আমাকে কোনও কথা বলে সেই কথাটা কিন্তু আমি গ্রহণ করছি না, করব না। আমি বলব যে এটা তোমাদের মনের কথা নয়, তোমরা অভিনয় করে বলছ। কিন্তু আমরা আবার অভিনয় করি পর্দায়। সেই পর্দার অভিনয়টাও বোধহয় এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে পর্দায় যখন দেখেন দর্শক বিচার করতে শুরু করেন যে এটা কি সে অভিনয় করছে নাকি সে চরিত্রটা হয়ে উঠছে? গান তো আমি রেগুলার করি না, মাঝেমধ্যে খুব অল্প গান করি। সেই গানটা যখন আমি গাই, প্রত্যেকটা চরিত্র বা গানের কথা বা সুরের ক্ষেত্রে ভিতর থেকে তো একটা ফিল তৈরি হয়, তাই না? আর সেই ফিলের জায়গা থেকেই তো আমার এক্সপ্রেশনে কিছু একটা আসে। এবার আমি যদি অভিনয় করে সেই ফিলটা দেওয়ার চেষ্টা করি তখন সেটা দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু আমার চোখে মুখে আমার অভিনয়টা যদি অভিনয় মনে না হয়ে মনে হয় যে উনি আসলেই ওই লোকটি। উনি যখন অভিনয় করছেন কোনও চরিত্রে উনি আসলে সেই চরিত্রটি, উনি যখন গান করছেন তখন গানের কথা-সুর সবকিছু মিলিয়ে যে ভাবের প্রকাশ হওয়া উচিত, তাই প্রকাশ পায় উনার চোখেমুখে বা এক্সপ্রেশনে! এইটাই তো স্ট্রাগল যে আমরা কেউ যেন অভিনয় না করি। আজকে সোসাইটিতে বেশিরভাগ মানুষই তো আমরা অভিনয় করছি।

প্রশ্ন: সোশ্যাল মিডিয়ার জায়গায়ও একটা অভিনয় ব্যাপার থাকছে…

চঞ্চল: … পুরোটাই অভিনয়ের জায়গা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। ওইটা সম্পর্কে আর নাই বলি। ওইটা আমাদের দেশে, এই দেশে, সব দেশেই এক। এখানে সবাই ভাল মানুষ, সবাই জ্ঞানী। সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রত্যেকে ভাল মানুষ, প্রত্যেকে জ্ঞানী এবং প্রত্যেকে সবকিছু বোঝে।

প্রশ্ন: এবং সবকিছু নিয়ে মোটামুটি একটা বক্তব্যও রেখে থাকে…

চঞ্চল: … একদম। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্ম, প্রত্যেকটা বিষয়ে একদম ওভার কনফিডেন্ট। (হাসি)

প্রশ্ন: কিন্তু আপনার সোশ্যাল মিডিয়া থেকে যেটা দেখি যে আপনি মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালবাসেন। আপনি সমস্ত শ্রেনীর মানুষের সঙ্গে মেশেন। মানুষের মধ্যে নিরন্তর মিশতে থাকা, নিজেকে অ্যাভেইলেবল্ রাখার ফলে স্টার ভ্যালুটা অ্যাফেক্টেড হতে পারে মনে হয়নি কখনও? আমি ‘কোট আনকোট’ আপনাকে ‘স্টার’ই বলব কারণ আপনি নিজেও জানেন যে চঞ্চল চৌধুরীর একটা স্টার ভ্যালু রয়েছে।

চঞ্চল: যখন কেউ নিজে স্টার হয় বা হতে চায় বা ইমেজটাকে ব্যবহার করতে চায় তাঁর কাজের ক্ষেত্রে, আমার মনে হয় সেটাও অভিনয় হয়ে যায়। সেটা অভিনয় নয়?

প্রশ্ন: একদমই।

চঞ্চল: আমার তো আসলে টার্গেট যে আমি জীবনে অভিনয় করব না। আমার ব্যক্তিগত জীবনেও না, আমার চরিত্রেও নয়। আমি অভিনয় করব না। আমি যখন বাবা, তখন আমি বাবা-ই। বাবার চরিত্রে অভিনয় করতে চাই না। আমার ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলছি, আমি যখন স্বামী, তখন স্বামী; আমি যখন সন্তান, তখন সন্তান আর যখন ভাই তখন ভাইই।

প্রশ্ন: আপনি হয়ে ওঠায় বিশ্বাসী…

চঞ্চল: হ্যাঁ। যেটা যতটুকু পারি সেটায় সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে বিভিন্ন ঝামেলার কারণে। কিন্তু এই যে দর্শক পছন্দ করছেন আমাকে বা অনেক মানুষ আমার অভিনয় ভালবাসেন বা আমাকে ভালবাসেন তার মানে যে আমি তাঁদের থেকে ছিটকে আকাশে উঠে গেলাম বা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলাম বা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব না বা কাছে চলে এলে আমার ইমেজ নষ্ট হয়ে যাবে আমি সেটা কখনওই মনে করি না। আমি খুবই সাধারণ জীবন যাপন করি। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটি-ফিরি, যদিও খুবই কম যাই। বাজার হাটে যাওয়া হয় না তবে দোকানপাটে কিছু দরকার হলে আমিই কিনি। আমার খুবই সাদামাটা একটি বাসা, যে বাসাটায় আমি থাকি। আমি রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটি একজন সাধারণ মানুষ হয়েই, আমি তো তাঁদেরই প্রতিনিধি। আমি কলকাতায় এসেছি, মুভ করছি কেন আমার সঙ্গে কোনও বডিগার্ড নেই! কেন আমাকে আলাদাভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হচ্ছেনা! এবারে সেফটি সিকিউরিটির কারণে অনেকে রাখেন সেটা আলাদা ব্যাপার। আমি অনেকের কাছেই একেবারে সহজলভ্য। আমি কখনোই মনে করি না যে ধরাছোঁয়ার মধ্যে চলে গেলে ওই জিনিসটা হারিয়ে যায়। যাঁরা এটা মনে করেন, তাঁরা হয়ত একটা ফর্মুলাতে বিশ্বাস করেন। আমাকে এক কোটি মানুষ চিনুক, দশ কোটি মানুষ চিনুক, পাঁচ কোটি কি পাঁচজন মানুষ চিনুক আমার তাতে কিছু যায় আসে না। আমি আমার কাজটি করছি, আমার কাজটি যদি তাঁদের পছন্দ হয় হবে।

প্রশ্ন: বাহ্।

চঞ্চল: যেমন এই দেড়-দু’মাসে আমি নিজে একটাও ‘হাওয়া’র টিকিট কিনতে পারিনি। আমি পাইনি টিকিট। আমার সিনেমা, আমি আমার ফ্যামিলি নিয়ে বা বন্ধুদের নিয়ে বসে দেখব টিকিট পাচ্ছিনা। মুখ ঢেকে, ক্যাপ পরে হলের চারপাশ দিয়ে বারবার ঘোরাঘুরি করেছি কিন্তু আমি নিজেই ঢুকতে পারছি না হলের মধ্যে সেই সিনেমা দেখার জন্য। এখন আমি ওখানে ঢুকতে ঠিকই পারতাম চারজন বডিগার্ড নিয়ে একদম লোকজন সরিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার করে, কিন্তু আমার দরকার নেই তো ওটার। আমার কাজ মানুষ দেখছেন, তাঁরা ভাল বলছেন বা তাঁদের ভাল লাগছে এটাই আমার সবথেকে বড় অ্যাচিভমেন্ট। সেখানে তো আমার শো-অফ্ করার কিছু নেই।

প্রশ্ন: আপনি বললেন যে আপনি হয়ে ওঠায় বিশ্বাসী। আমরা দেখি যে আপনি শুদ্ধ’র জীবন একদম অন্যভাবে গড়ার চেষ্টা করেন। আপনি নিজে যে রকম সাধারণভাবে বাঁচেন, ওর জীবনবোধটাকেও সেই জায়গায় বেঁধে দেন। বাবা হিসেবে শুদ্ধ’র জীবনে চঞ্চল চৌধুরীর অংশগ্রহণে কি আপনার জীবনে আপনার বাবার অংশগ্রহণের ছাপ থাকে?

চঞ্চল: ওর জীবনে ছাপটা এমন, আমি জানি না এখান থেকে সবচেয়ে ভালো কিছু হওয়া হতে পারে আবার সবচেয়ে খারাপ কিছু হওয়া হতে পারে। কারণ, সুযোগগুলো অনেক সময় মানুষকে নষ্ট করে দেয়। আমি যখন ছোট, আমি আমার বাবাকে দেখেছি আর অনুসরণ করেছি। তখন যা সমাজ ছিল এবং আমাদের আর্থিক অবস্থা যা ছিল সবকিছু নিয়ে সেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে জীবনে দাঁড়াব, কোথায় নিজের পায়ের তলায় একটু মাটি পাব সেই স্ট্রাগলটা ছিল। তারপর আমার গান, অভিনয়ের প্রতি দুর্বলতা ছিল বলে সেই প্ল্যাটফর্মে এসে কিছু একটা করা। আমার ছেলের ক্ষেত্রে কিন্তু পরিস্থিতি একদম ভিন্ন। ও তৈরি হওয়া একটা সুন্দর সময় পাচ্ছে। আমাদের সুন্দর সময় ছিলনা, সেটা অর্জন করে নিতে হয়েছে। এবারে সুন্দর সময় যার হাতে আছে সে এই সময়কে আরও সুন্দর করার জন্য স্ট্রাগল করবে কিনা সেটা সময় বলে দেবে। তবে আমি আমার নিজের কেরিয়ার নিয়ে কখনোই চিন্তা করি না। আমি আমার কাজ যতদিন সুস্থ আছি, বেঁচে আছি, করব আমার মত। এতদিন পর্যন্ত করেছি, বাকিটাও একইভাবে আর একই চিন্তাভাবনা নিয়ে করে যাব। সেটা নিয়ে আমার কোনও টেনশন নেই। আমার টেনশনটা হচ্ছে যে আমার সন্তান আসলে কি করবে! আমি এটা বলছি না যে, অভিনয় করুক বা এটা করুক, সেটা করুক। যাই করুক না কেন, এখন ওর জীবনের সফলতা বা বিফলতার উপর নির্ভর করছে আমার শেষ জীবনের ফাইনাল সাকসেসটা। আমি যদি একজন ভাল মানুষ হিসেবে ওকে দাঁড়াতে দেখি তাহলেই এতদিনের আমার যে অ্যাচিভমেন্ট সেটা পরিপূর্ণতা পাবে, তার আগে পর্যন্ত পাবে না। সে আমি যাই করি না কেন। আমার এরকম কিছু নয় যে ও প্রচুর টাকা উপার্জন করবে বা কিছু। সেটা না। দায়িত্বশীল একজন মানুষ হিসেবে নিজের একটা জায়গায় দাঁড়াবে এবং যে পেশাতেই নিয়োজিত হোক না কেন সেই কাজটি করে কিছু সম্মান যেন উপার্জন করে।

প্রশ্ন: যেটা আসল উপার্জন…

চঞ্চল: … যেটা আসল উপার্জন। যেটা আমি সারা জীবন করার চেষ্টা করেছি এবং আমার ফ্যামিলি থেকে বা আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছি। আমার সাকসেস কিন্তু একটা ‘হাওয়া’ বা একটা ‘কারাগার’ নয়, আমার সাকসেসটা আরও সামনে। আমার ছেলের বয়স এখন ১২ বছর, ও কি হবে তার উপরে নির্ভর করবে আমার সাকসেস। আমার বাবা-মা এখন বলতে পারেন যে তাঁরা সাকসেসফুল কারণ, আমরা যে কয়টা ভাইবোন ছিলাম তাঁরা খুব বেশি ভাল কেউ কিছু না করলেও কারোর জন্য আমার বাবা-মায়ের মাথা কখনও নিচু হয়নি। আমাদের সোসাইটিতে বাবা-মায়ের ভাবনাটা হয়ত এখন এই জায়গা থেকেই করা উচিত। নিজেদের অ্যাচিভমেন্ট নিয়ে আমরা সব সময় তো এত ব্যস্ত থাকি, আমার সন্তানের অ্যাচিভমেন্টটা কি হবে? ওকে কি আমরা সেই আলাদা জায়গা তৈরি করে দিচ্ছি? পরবর্তী প্রজন্মকে যদি দাঁড় করানো যায় তাহলে বোধহয় আমাদের অনেক সংকট কেটে যাবে। ওদের ভাবনা চিন্তায় মিডিয়াম না ঢুকিয়ে, কোন মিডিয়ামে পড়েছে কোথায় পড়ছে না ঢুকিয়ে, মানুষ, দেশ, প্রেম এই বিষয়গুলো বোধহয় একটু ঢুকিয়ে দেওয়া উচিত। তথাকথিত আধুনিক হওয়ার শিক্ষা না দিয়ে মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা দিলে বোধহয় দেশ উপকৃত হয়, সোসাইটি উপকৃত হয়।

Loading

Spread the love