অতনু রায়

কলকাতা, জুন ২৪: বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার তিনি। নাট্যমঞ্চ থেকে ছবির পর্দায় তাঁর বিচরণ অবাধ। চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি বিশেষ বিশেষ চরিত্রে তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। আজ মুক্তি পেল পবন কানোড়িয়া প্রযোজিত এবং শায়ন্তন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘ঝরা পালক’। এই ছবিতে কবি জীবনানন্দ দাশের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় মন ছুঁয়েছে চলচ্চিত্র উৎসবের দর্শকদের। পর্দার জীবন কবি, বাস্তবের ব্রাত্য বসু একান্তে কথা বললেন আমাদের সঙ্গে।

প্রশ্ন: ‘ঝরা পালক’ জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু যে জীবনানন্দকে বাঙালি চেনে, কাব্যগ্রন্থে কিন্তু সেই জীবনানন্দ ধরা পড়েন নি, তখন তো অন্ত্যমিলের জীবনানন্দ…

ব্রাত্য: হ্যাঁ, ঠিকই। ২৮ – ২৯ বছর বা আরও কম বয়সে লেখা।

প্রশ্ন: ‘ঝরা পালক’ এর জীবনানন্দ এবং তার পরবর্তী সময়ের জীবনানন্দের বদলটা এই ছবিটা করতে গিয়ে চিত্রনাট্যের মধ্যে কতটা দেখতে পেয়েছেন?

ব্রাত্য: এই চিত্রনাট্যের মধ্যে সেটা বেশ ভালই ধরা পড়েছে। কবি হিসেবে বিবর্তিত হতে হতে যাচ্ছেন জীবনানন্দ, আবার একজন ব্যক্তি হিসেবেও বিবর্তিত হতে হতে যাচ্ছেন। আবার সমাজ থেকে নানা ভাবেই তিনি প্রতারিত হচ্ছেন, প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন। আর যতই নিজেকে অন্দরমহলে গুটিয়ে নিচ্ছেন, আরও আঁটিয়ে নিচ্ছেন, ততই তাঁর কবিতাও আস্তে আস্তে ইন্টেনস্ হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর লেখার জগতে তিনি স্বস্তিও খুঁজে পাচ্ছেন। তিনি বুঝতে পারছেন যে গোটা পৃথিবী যে ভাবে চলে চলুক, তিনি নিজের লেখালেখির যে একটা আলাদা জগত তৈরি করে নিয়েছেন। যেখানে ইতিহাস আছে, বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগত আছে, ম্যাসিডোনিয়া আছে, ব্যাবিলন আছে, তার মানে তিনি নিজস্ব ইতিহাস তৈরি করছেন। এবং ইতিহাস খুললেই শত শত ঝর্ণার ধ্বনিও তিনি শুনতে পাচ্ছেন, যে ঝর্ণার ধ্বনিতে মানুষের হৃদস্পন্দন মিশে আছে। এই পুরোটাই এই ছবিতে শায়ন্তন (মুখোপাধ্যায়) ধরার চেষ্টা করেছে। এবারে এটাই দেখার মানুষ কতটা এই ছবির সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারেন।

প্রশ্ন: সেই সময়ে বুদ্ধদেব বসু ও কিছু কবিরা যেরকম ভাবে তাঁকে সমর্থন করেছেন তেমনভাবেই যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও কিছু কবি কিন্তু কাটাছেঁড়া করে প্রচুর লেখালেখি করেছেন। এও শোনা যায় ‘অশ্লীল কবিতা’ লেখার অপরাধে নাকি তিনি সিটি কলেজের অধ্যাপনার চাকরি খোয়ান?

ব্রাত্য: না, না, সিটি কলেজে উনার চাকরিটা গিয়েছিল কারণ তখন একটা মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল। একসঙ্গে অনেক অধ্যাপকেরই চাকরি যায়। জীবনানন্দ তাঁদের অন্যতম ছিলেন কিন্তু কোনও অশ্লীল কবিতা লিখবার জন্য জীবনানন্দের চাকরি যায়নি। যদিও বা আমাদের সমাজে শ্লীল-অশ্লীল ব্যাপারটা গোঁড়া ছুৎমার্গ অর্থে আছে এক ধরণের ভিক্টোরিয়ান মানসিকতায়। তবে জীবনানন্দের চাকরিতে তার কোনও প্রভাব পড়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই।

প্রশ্ন: আমি এক জায়গায় পড়েছিলাম যে, ‘অশ্লীলতার হাঁড়িকাঠে জীবনানন্দই প্রথম বলি’…

ব্রাত্য: … না, না, ভুল তথ্য ওটা। কারণ জীবনানন্দের একার চাকরি যায়নি, ৪-৫ জনের চাকরি গিয়েছিল।

প্রশ্ন: কবিতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কবি মানসের একটা বিবর্তন হয়। আপনি নিজের এতদিনের জীবনানন্দ চর্চার জায়গায় দাঁড়িয়ে এই চরিত্রের সঙ্গে কি করে নিজেকে একাত্ম করলেন?

ব্রাত্য: আবার নতুন করে আমি জীবনানন্দ সম্পর্কে পড়লাম। জীবনানন্দের কবিতা পড়া ছিল, গদ্য পড়া ছিল, গোপাল চন্দ্র রায়ের লেখা কবির জীবনী পড়া ছিল। শাহাদুজ্জামানের লেখা ‘একজন কমলালেবু’ বইটা আমার খুব কাজে লাগল এবং আমি খুব ইন্সপায়ার্ড হয়েছি। সেইটা অভিনয়ের ক্ষেত্রে খুব কাজে দিয়েছে এটা বলব।

প্রশ্ন: জয়া আহসান এখানে কবির স্ত্রী লাবণ্য চরিত্রে অভিনয় করছেন। লাবণ্য দেবীর লেখা ‘মানুষ জীবনানন্দ’ও কি পড়েছিলেন অভিনয়ের আগে?

ব্রাত্য: ওই বইটা তো অনুলিখন করা এবং অনেকটাই এডিটেড, তাও ওইটা খানিকটা খানিকটা পড়েছি। ওখানে সম্পর্কের ভাল দিকগুলো, বাংলা সাহিত্যের বিষয়গুলো কিভাবে উনি লিখতেন সেইগুলো আছে। এর বাইরে অনেক টেনশনের বিষয়ও ছিল, সেগুলো আবার আমি শাহাদুজ্জামানের লেখা থেকে পেয়েছি।

প্রশ্ন: আজকে ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে আপনার কি মনে হয় যে আগের তুলনায় জীবনানন্দ দাশের কবিতা এখন বেশি পরিমাণে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে?

ব্রাত্য: যে মননের কাছে জীবনানন্দ গ্রহণযোগ্য, তাঁদের কাছে এখনও গ্রহণযোগ্য। তবে গড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তাতে জীবনানন্দের কিচ্ছু যায় আসে না, জীবনানন্দের কবিতার কিছু যায় আসে না।

Loading

Spread the love