অতনু রায়

কলকাতা, এপ্রিল ২৫: চিদানন্দ দাশগুপ্ত, নামটাই যথেষ্ট। তিনি সব অর্থেই একজন কিংবদন্তি। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমরা তাঁর সম্বন্ধে খুব সামান্যই জানি। ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’র সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্র সমালোচনাকে তিনি নিয়ে গেছেন আন্তর্জাতিক স্তরে আর এক আকাশছোঁয়া উচ্চতায়। জন্ম ১৯২১-এর ১৯শে নভেম্বর। এবছর তাঁর শতবর্ষ উদযাপনের কালে তাই চেষ্টা করেছি তাঁর বর্ণময় জীবনের চলার পথটা একবার ফিরে দেখতে। আর সেই পথে তাঁর কন্যা কিংবদন্তি অপর্ণা সেনের থেকে বেশি আলো আর কেই বা ফেলতে পারেন? অপর্ণা সেন-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তাই ভাঙতে চেয়েছি একটা মিথ। চিদানন্দ বাবুকে অপর্ণা সেনের বাবা হিসেবে নয় বরং অপর্ণা’কে চিনে নিতে চেয়েছি কিংবদন্তি চিদানন্দ দাশগুপ্ত‘র কন্যা হিসেবে:

প্রশ্ন: হাজারীবাগের মতো একটি জায়গাতে থেকেও কিভাবে ‘চিদানন্দ দাশগুপ্ত’ হয়ে ওঠা যায়?

অপর্ণা সেন: দেখো, বাবা তো হাজারীবাগে সব সময় থাকেন নি। আমার ঠাকুরদা ব্রাহ্ম মিশনারি ছিলেন আর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেন। একটা বয়সের পর আমার ঠাকুরদা হাজারীবাগে এসেছিলেন। বাবা কিন্তু জন্মেছেন চেরাপুঞ্জিতে এবং কিছুটা বেড়েও উঠেছেন সেখানে। তারপর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে হাজারীবাগে এসে পৌঁছান। পরে বাবা হাজারীবাগে অথবা পাটনায় খুবই নামকরা কোনও একটি খ্রিস্টান কলেজে পড়তেন। আমার ঠাকুরদা চিরকালই খুব দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন। যেটা নিজে ঠিক করতেন এবং ভাল বলে মনে করতেন, সেটাই করতেন। একেবারেই নির্ভীক মানুষ ছিলেন। আমার বাবা, কাকা স্বাধীনতা সংগ্রাম করতেন। সেটা অবশ্য তখনকার দিনে অনেক ছেলেরাই করত। আমার বাবা সেইসব করে সেখান থেকে পালিয়ে যেতেন। এসব দিক থেকে খুব প্র্যাকটিক্যাল ছিলেন। আর আমার কাকা আবার উল্টো ছিলেন। কাকা জেলেও গিয়েছিলেন। বাবা এইসব করেছেন বলে বাবাকে কলেজ থেকে ‘রাস্ট্রিকেট’ করে দেওয়া হবে এইরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হল। বাবা যেহেতু খুব ভালো ছাত্র ছিলেন, সেক্ষেত্রে বলা হল যে এত ভালো ছাত্রকে আমরা ‘রাস্টিকেট’ করতে চাই না। তবে, ও যদি একটা বন্ড লিখে দেয় যে ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আর কিছু করবে না তাহলে আমরা ওকে নিয়ে নেব। আমার ঠাকুরদা তখন বললেন যে, “ও যদি বন্ড লিখে দেয়, তাহলে আমিই ওকে সবথেকে আগে বাড়ি থেকে বার করে দেবো”।

প্রশ্ন: তবে তো খুব কড়া শাসন ছিল বাড়িতে?

অপর্ণা সেন: ঠাকুরদা গান্ধীবাদী ছিলেন এবং চরকা কাটতেন। বাবার যখন আট-দশ বছর বয়স তখন থেকেই ঠাকুরদা বাবাকে বুঝিয়ে হাটে পাঠিয়ে দিতেন ওই চরকা দিয়ে কাটা সুতো আর কাপড়ের বান্ডিল দিয়ে। ফিরে এসে আবার হিসেব দিতে হতো যে কত টাকার বিক্রি হয়েছে বা কি বৃত্তান্ত। আমার ঠাকুরদার চরিত্রের নৈতিক দৃঢ়তাটা আমার বাবার মধ্যেও এসেছে, কিন্তু অন্যভাবে এসেছে। আমার বাবা কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না আর আমার ঠাকুরদা ঈশ্বরে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। ঠাকুরদা হাজারীবাগ ব্রাহ্মসমাজের আচার্য ছিলেন। সেখানে তার ডিসপেনসারিও ছিল যেখানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা হত। আমার বাবার মধ্যে যেটা এসেছিল, সেটা হচ্ছে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ সততা। যেমন, বাবা যখন কোনও কিছু লিখতেন সেটার মধ্যে কিন্তু কোনো ফাঁকি থাকত না। আমার বাবা এবং মা দুজনের চরিত্রের মধ্যেই একটা নৈতিকতার জায়গা ছিল যেটা পরবর্তীকালে আমার বা আমার বোনের মধ্যেও এসেছে। এভাবেই ‘চিদানন্দ দাশগুপ্ত’ হয়ে ওঠা। তারপরে বাবা তো কলকাতায় চলে এলেন। আর একটা ব্যাপার আমি বলব, আমি যেহেতু বাবা-মায়ের খুব অল্প বয়সের সন্তান তাই এই চিদানন্দ দাশগুপ্ত হয়ে ওঠার অনেকটাই আমি দেখেছি।

প্রশ্ন: ইংরেজী ভাষার উপর উনার যে অসম্ভব দখল, সেটা কী ছোট থেকেই?

অপর্ণা সেন: তখনকার দিনে ‘ইনস্পেক্টরস্ অব স্কুলস্’ যারা ছিলেন, তারা ছিলেন ব্রিটিশ। বাবা খেয়াল করলেন, ভদ্রলোক তো বেশ অন্যরকম ভাবে কথা বলেছেন। বাবা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি যে রকম ভাবে ইংরেজি বলছেন আর বাকিরা যেভাবে ইংরেজি বলছে তার মধ্যে তো অনেকটা তফাৎ। এটা কেন?” বাবা তাঁর কাছে জানতেও চাইলেন যে কিকরে ওইরকমভাবে ইংরেজি বলা যায়। এই ঘটনায় তিনি খুব খুশি হলেন এবং বাবাকে ডিকশনারি খুলে দেখিয়ে দিলেন কোথায় অ্যাক্সেন্টটা পড়লে কিভাবে উচ্চারণ করতে হয়। সেটা বাবা খুব ভালোভাবে শিখেছিলেন। বাবা খুব সুন্দর ইংরেজি বলতেন। সত্যজিৎ রায়ও খুব ভালো ইংরেজি বলতেন। আমার মনে হয়, ব্রিটিশ প্রভাবটা ছিল বলেই এরা খুব ভালো ইংরেজিটা বলতেন। বাংলা ও ইংরেজি দুটোই সমান ভালোভাবে বলতে পারতেন। বাবার থেকে সেটা আমার উপরেও কিছুটা বর্তেছে।

প্রশ্ন: কলকাতায় উনার শুরুটা কেমন ছিল?

অপর্ণা সেন: কলকাতায় এসে কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে এম.এ. করেছেন। তার আগেই অবশ্য আলাপ হয়েছে মানিক কাকার (সত্যজিৎ রায়) সঙ্গে। কারণ মানিক কাকা কোনও কারণে হাজারীবাগে গিয়েছিলেন। সেই থেকেই ওদের পরিচয় ছিল। শুনেছি, মানিক কাকার মা আর আমার ঠাকুরদা পরিচিত ছিলেন। যে কোন ভাবেই হোক ওঁদের দুজনের দেখা হয়েছিল। দুজনে সমবয়সী। মানিক কাকার জন্ম ১৯২১-এর মে মাসে আর বাবার নভেম্বরে। বাবা কলকাতায় আসার পরে সেই পরিচয় এবং বন্ধুত্বটা আরও পাকা হল। কলকাতায় স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে তখন ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ। আমার ঠাকুরদা বোধহয় তাঁকে চিনতেন। আমার বাবাও তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। বন্ধু-বান্ধবের ছেলেরা, যারা পড়াশুনায় ভালো, তারা উনার কাছে যেতেন। উনি নাকি তাদেরকে বলতেন, “ঠিক আছে, সোমবার থেকে এসো”। আমার মনে হয়, মানিক কাকাও স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে কিছুদিন কাজ করেছেন। বাবা কিছুদিন প্রফেসর হিসেবেও কাজ করেছেন। অল্পবয়সী প্রফেসর, ছেলেরা মানতে চাইতো না আর কি!

প্রশ্ন: সঙ্গীতের প্রতি উনার ভালোবাসা কি কলকাতায় এসেই পূর্ণতা পায়?

অপর্ণা সেন: বাবার আর মানিক কাকার দুটো কমন ভালোবাসা ছিল। একটা হচ্ছে সিনেমা, আরেকটা হল সঙ্গীত। সেটা আবার ধ্রুপদী সংগীত মানে ক্ল্যাসিকাল মিউজিক, বিশেষত ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিকাল মিউজিক। কলকাতায় তখন হ্যারি’স মিউজিক হাউস বলে একটা দোকান ছিল। সেইখানে ওঁরা গান শুনতে যেতেন। আমিও ছোটবেলায় যতদূর মনে পড়ে বাবার সাথে গিয়েছি। সেই দোকানে বেশ কয়েকটা কিউবিকল্ ছিল। তার মধ্যে বসে রেকর্ডটা বাজিয়ে শুনে ক্রেতারা ঠিক করতে পারতেন যে তারা সেটা কিনবেন কিনা। বাবা আর মানিক কাকা সেখানে গিয়ে রেকর্ডটা শুনতেন। কিন্তু কিনবার পয়সা তো ছিল না, সেই জন্য শুনে বলতেন “না ঠিক ভাল লাগছে না, আমরা কিনব না”। কিন্তু খুব মন দিয়ে তাঁরা মিউজিকটা শুনতেন।

প্রশ্ন: এভাবেই ওঁরা কালচারালি এত সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছেন…

অপর্ণা সেন: সঙ্গীত সম্বন্ধে বাবার আমৃত্যু ভালোবাসা ছিল। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল, ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিকাল এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত। একটা মজার কথা বলি, বাবার ছোটবেলায় নাকি গানের গলা ছিল না। হাজারীবাগে যে ব্রাহ্ম মন্দিরটা ছিল সেটার একটা বড় বারান্দা ছিল। সেখানে একটা অর্গ্যান ছিল। বাবা সেই অর্গ্যানে সা-রে-গা-মা বাজাতে শিখে নিয়েই রোজ “গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ” গাইতেন আর সকলের কান ঝালাপালা হয়ে যেত। এই করতে করতে পরে বাবার কিন্তু একটা গানের গলা হল। আর বয়স হবার পরে বেশ ভালই গাইতেন। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় যখন আমরা পন্ডিতিয়ায় থাকতাম তখন কালিবাবু বলে একজন আমাদের বাড়িতে আসতেন। ক্ল্যাসিকাল গানের চর্চা হত। আমি একদিন বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাবা তুমি কেন এগুলো করো? তুমি কি গান গাইবে? বাবা বললেন, “না। আসলে আমি সঙ্গীতের বিভিন্ন রাগের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই। আরও ভালো করে শিখতে চাই, যাতে আমি গান-বাজনাকে আরও ভালোভাবে উপভোগ করতে পারি”। এই ধরনের সঙ্গীতপাগল মানুষ ছিলেন বাবা।

প্রশ্ন: বাবার সঙ্গীতবোধ কি আপনার সঙ্গীতের রুচিকে প্রভাবিত করেছে?

অপর্ণা সেন: সেটা তো আমি ঠিক বলতে পারব না। এটা বাইরের লোক বলতে পারবে। তবে হ্যাঁ, আমি, মা আর বাবা একসাথে গান-বাজনা শুনতাম। 

প্রশ্ন: সাহিত্যের ক্ষেত্রেও কি একই রকম ঘটত?

অপর্ণা সেন: ওঁরা দুজনেই সাহিত্য ভালোবাসতেন। আমাকে অনেক পড়েও শোনাতেন। জীবনানন্দ, সুইনবার্ন। অনেক সময় সুইনবার্নের অনেক লেখার মানে বুঝতাম না। কিন্ত ভাষার যে একটা সঙ্গীতময়তা, সেটা কিন্তু ভেতরে ঢুকে যেত। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এটা হত। আমি খুব ছোটবেলায় জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়েছি। আমি যখন স্কুলে পড়ি, ক্লাস ওয়ান কিংবা টু খেয়াল নেই, আমাদেরকে একটা রচনা লিখতে বলা হয়েছিল। আমি তাতে ‘ধানসিঁড়ি নদী’ কথাটা ব্যবহার করেছিলাম। আমাদের বাংলা টিচার ছিলেন সুপ্রিয়া ঘোষ (শান্তিদেব ঘোষের ভ্রাতৃবধু)। তিনি বললেন, “অপর্ণা, এই ধানসিঁড়ি নদী কথাটা তুমি কোথায় পেলে? জানো এটা কি জিনিস?” আমি বললাম, আমি জীবনানন্দ দাশের কবিতাতে পেয়েছি। তিনি বললেন, “তুমি জীবনানন্দ দাশের কবিতা জানো? তোমার একটাও মনে আছে? একটা শোনাও তো দেখি”। বললাম, হ্যা পড়েছি। আমার ‘বনলতা সেন’টা মুখস্থ ছিল, সেটা আমি গড়গড়িয়ে বলে দিলাম। উনি হতভম্ব হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাবা-মার নাম কি”? আমি বললাম, চিদানন্দ দাশগুপ্ত আর সুপ্রিয়া দাশগুপ্ত। বললেন, “ওহ্! তাই বলো”।

প্রশ্ন: ওই বয়সে ‘বনলতা সেন’ মুখস্থ থাকাটাই তো বিরাট ব্যাপার…

অপর্ণা সেন: জীবনানন্দ দাশ আমার মায়ের জ্যাঠতুতো দাদা ছিলেন। উনি সবার চেয়ে বড় ছিলেন বলে মায়েরা বড়দা বলতেন। সন্দেশের যে বাড়িটা ছিল, যেখানে নলিনী দাশ থাকতেন ওই বাড়িতেই থাকতেন উনি। কলেজে পড়াতেন। আমাদের বাড়ি খুব আসতেন। কারণ, বাবার সঙ্গে ভীষণ বন্ধুত্ব ছিল। আমরা অত কিছু জানতাম না, বুঝতামও না। উনার ডাকনাম ছিল ‘মিলু’ তাই আমরা মিলু মামা বলতাম। কিন্তু উনি যে একজন বিরাট মাপের কবি সেটা কিন্তু আমি তখনও বুঝিনি। আমি অবশ্য ছোটও ছিলাম। উনি যখন চলে গেলেন ১৯৫৪ সালে, তখনই আমার দশ বছর হয়নি।

প্রশ্ন: আর্টের ব্যাপারেও তো খুবই উৎসাহী ছিলেন ওঁরা?

অপর্ণা সেন: হ্যাঁ। অনেক আর্টের বইও ছিল আমার বাবা-মা’র কাছে। এসব খুব পছন্দ করতেন দুজনেই। আমিও গরমের ছুটির সময় বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে, ছবিগুলো দেখতাম। তাই আমারও ওই ছবিগুলোর সাথে একটা চেনা জানা হয়ে গিয়েছিল। রেনোয়াঁ’র (Pierre-Auguste Renoir) ছবি দেখলে আমি চিনতে পারতাম। ‘ইম্প্রেশনিস্ট’ বুঝতে পারতাম। আমি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘ইম্প্রেশনিস্ট’ কেন? বাবা বলতেন যে, একটা ইম্প্রেশন দেওয়া রয়েছে। ঠিক ফটোগ্রাফের মতো নয়। 

প্রশ্ন: বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে উনার সম্পর্ক কিভাবে হল?

অপর্ণা সেন: কলকাতায় আসার পর আস্তে আস্তে বাবার একটা বন্ধুমহল তৈরি হল। তারপরে একটা ঘটনা হল, যেটা আমাদের জীবনে একটা পরিবর্তন আনল। বাবা কাজ করতেন D. J. Keymer-এ। মানিক কাকাও ওখানে কাজ করতেন। মানিক কাকা আঁকতেন, মানে ইলাস্ট্রেশনের দিকটা দেখতেন। বাবা ক্রিয়েটিভ পার্ট মানে কপি লেখা জাতীয় কাজ করতেন। সেই সময়ে ইম্পেরিয়াল টোবাকোতে (বর্তমানে আইটিসি) বাবা একটা চাকরি পেলেন। মা বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, “এইরকম চাকরি তুমি নিও না। তাহলে আমরা বদলে যাব”। বাবা বললেন, “এখন এটার দরকার, কারণ মেয়েদের মানুষ করতে হবে”। যে কোনও কারণেই হোক, বাবা চাকরিটা নিলেন। চাকরিটা নেওয়ার পর আমাদের লাইফস্টাইল অনেকটা বদলে গেল। আমরা অন্য একটা বাড়িতে গেলাম, যেটা ভীষণ সাহেবী। সেখানে বিরাট একটা বাগান আর বারান্দা ছিল। সেই বারান্দায় অনেক আড্ডা হত। সেই বাড়িতেই অনেক সময় ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির মিটিংগুলো হত। তারপরে রেনোয়াঁ (Jean Renoir) এলেন, তাঁর সাথে বাবার একটা বন্ধুত্ব হল। তিনি আমাদের বাড়িতেও আসতেন। আমি নাকি তার কোলে বসেছিলাম আর জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমার মুখটা এত লাল কেন? উনি নাকি বলেছিলেন, “আমি অনেক লঙ্কা খেয়েছি তো, তাই আমার মুখটা লাল”। নিশ্চিতভাবেই রেনোয়াঁর একটা প্রভাব বাবা, মানিক কাকা, হরিসাধন দাশগুপ্ত এদের অনেকের উপরেই পড়েছিল।

প্রশ্ন: উনারা সোসাইটিটাও তো একসঙ্গেই তৈরি করেছিলেন?

অপর্ণা সেন: হ্যাঁ। বাবা, মানিক কাকা, হরিসাধন দাশগুপ্ত, আমার মা আরও কয়েকজন সমমনস্ক মানুষ একসাথেই শুরু করেছিলেন।

প্রশ্ন: ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হল। একই সালে ওঁরা ফিল্ম সোসাইটিও তৈরি করলেন। বিদেশি সিনেমাও তখন আরো বেশি করে দেখার সুযোগ হল। এটা কি কোনোভাবে বাঙালির সিনেমাচিন্তাকেও স্বাধীন করে দেওয়ার প্রয়াস ছিল বলে মনে করেন?

অপর্ণা সেন: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তবে বিদেশি সিনেমা আনার ব্যাপারটায় মানিক কাকা ভীষণ সাহায্য করতেন। বিদেশি সিনেমা তখন তো আসতই না। হলিউড ছাড়া কিছুই আসত না। রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স এই সমস্ত জায়গার সিনেমা আনাটাই একটা বিরাট ব্যাপার ছিল।

প্রশ্ন: মানে ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’র সঙ্গে মানুষের পরিচয় করানোর শুরুও বলা চলে?

অপর্ণা সেন: হ্যাঁ, ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা’র সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। তারপর ১৯৫৫তে যখন ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পেল তখন মানিক কাকা অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সোসাইটিকে বেশি সময় দিতে পারতেন না। আমার মনে আছে, আমাদের পাম এভিনিউর বাড়ির বারান্দায় ৮ মিলিমিটার প্রোজেক্টারে অনেক ভালো ভালো সিনেমা দেখেছি আমরা।

প্রশ্ন: তার মানে উনি বদলে গেলেন না। ভালোবাসাগুলো একই তো থাকল?

অপর্ণা সেন: ইম্পেরিয়াল টোব্যাকোতে গেলেন বলে বাবার যে একটা আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। সাহেবিয়ানাটা উপর উপর রাখতে হল কিন্তু সেটা কখনোই ফিল্ম সোসাইটিকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠেনি। বাবা সোসাইটির সেক্রেটারি ছিলেন আর এটা একদম তাঁর প্রাণের জিনিস ছিল। আর এই ফিল্ম সোসাইটিতে এত ছবি দেখা, ছবি নিয়ে আলোচনা করা, বাবার মনটাকে তৈরি করত। বাবারও তো তখন এমন কিছু বয়স নয়।

প্রশ্ন: পরবর্তীকালে আপনিও যখন বাবার সঙ্গে বসে সিনেমা দেখতেন, তখন কি চিত্র সমালোচক চিদানন্দ দাশগুপ্তকে পেতেন? ছবি দেখবার পর সেটা নিয়ে কোনও আলোচনা হত?

অপর্ণা সেন: না সেটাতে বাবা বিশ্বাস করতেন না। একদম না বুঝলে, জিজ্ঞাসা করলে তখন বলতেন। যেমন যখন ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’ দেখলাম, সেটা বললেন যে রাশিয়ার কোন সময়, রেভোলিউশনের পর, এইরকম। তারপর এই ছবিটা করবার সময় আইজেনস্টাইনকে (Sergei Eisenstein) কি বলা হয়েছিল, সব কথা শোনার পরেও যে একটা অত ভালো ছবি তিনি করতে পেরেছিলেন সেইসব। সকলকেই বলতেন, আমাদেরকেও বলতেন। সব ছবি দেখতে নিয়ে যেতেন কিন্তু। তার মধ্যে অনেক ছবি বুঝতেই পারতাম না, তাও দেখতাম। এইসময় থেকে একটা ডিসিপ্লিন তৈরি হয়েছিল। বুঝেছিলাম, সবসময় না বুঝলেও উঠে চলে যাওয়াটা ঠিক নয়। না বুঝলে, বোঝার চেষ্টা করা উচিত। দ্বিতীয়বার দেখা দরকার।

প্রশ্ন: এটা আজ খুবই বিরল…

অপর্ণা সেন: আরেকটা ঘটনা তোমার সঙ্গে শেয়ার করি। আমি সংস্কৃততে খুব একটা ভালো ছিলাম না। তখন আমার জন্য একজন টিচার রাখা হয়েছিল তাঁর নাম ছিল সরযু দাস। তিনি এত সুন্দর ভাবে আমাকে সংস্কৃত বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে আমি ৯৬-৯৭ এরকম নম্বর পেতে শুরু করলাম। তারপরে সংস্কৃতর জন্য আর ফার্স্ট হয়েছিলাম বলে আমাকে ‘মেঘদূতম্’ দেওয়া হল। বাবা আর আমি একসঙ্গে বসে ওই ‘মেঘদূতম্’ পড়তাম। আমার এখনও মুখস্থ রয়েছে সেগুলো। আমাদের ওই বারান্দায় বসে বাবা আমাকে ‘মেঘদূতম্’ বোঝাচ্ছেন, এগুলো আমি খুব মিস্ করি। আবার ইংরেজিতে ভালো করছিলাম বলে স্কুল থেকে আমাকে শেক্সপীয়রের ‘কমপ্লিট ওয়ার্কস্’ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। আমার এখনও মনে আছে, আমার সঙ্গে বসে বাবা ‘জুলিয়াস সিজার’, ‘অ্যান্টনি এন্ড ক্লিওপেট্রা’ একসঙ্গে পড়েছেন। আমি কলেজে যাবার পরেও সেটা হয়েছে।

প্রশ্ন: ভালো সাহিত্যের প্রতি আপনার আকর্ষণ তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল?

অপর্ণা সেন: হ্যাঁ, বলতে পারো। একবারের ঘটনা শোনো। কলেজে যাবার পরে কাজল দি (কাজল বোস) আমাকে বলেছেন, ওয়ার্ডসওয়র্থ-কে নিয়ে লিখতে। আমার তখন খুব নাক উঁচু স্বভাব ছিল। বলতাম, ওয়ার্ডসওয়র্থ কি এমন লেখেন? এলিয়ট কেন পড়ানো হয় না? কাজল দি জানতে চাইলেন, “ওয়ার্ডসওয়র্থ এর কী কী পড়েছ?”। আমি বললাম। তখন কাজল দি বললেন, “দুটো তিনটে কবিতা পড়েই ওয়ার্ডসওয়র্থকে তুমি উড়িয়ে দিচ্ছো কবি হিসেবে?” আমি ভীষণ অপমানিত বোধ করে বাবাকে এসে বললাম। বাবা বললেন, “বেশ হয়েছে। তোর এরকম বলাই উচিত হয় নি। তুই বরং ওয়ার্ডসওয়র্থ-এর ‘দ্য প্রিলিউড’টা পড়। চল্ আমরা একসঙ্গে পড়ি”। এই জিনিসটা বাবার খুব ছিল। এটা কিন্তু পড়ানো নয়, একসাথে দুজনে মিলে এনজয় করা। যেখানে বুঝতে পারছি না, বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এইটা আমি বাবা-মা দুজনের কাছ থেকেই পেয়েছি। দুজনে একসাথে কবিতা পড়ছেন, দুজনে একসাথে গান গাইছেন…এইগুলো খুব ছিল। ওদের একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। আমার বাবা-মা দু’জনেরই ছিল ‘লাইফ ইন্ দ্য আর্টস’। বাবা খুব সুন্দর ছবিও তুলতেন।

প্রশ্ন: বাড়ির আড্ডা থেকেই তো সবসময় অনেক মানুষের সান্নিধ্য পেতেন। সেটা আপনাকে কতটা নতুন করে তৈরি করত?

অপর্ণা সেন: কত যে মানুষ আমাদের বাড়িতে আসতেন সে আর বলার কথা নয়। আমাদের বাড়িতে একটা বিরাট আড্ডা বসতো। সান্ধ্য আড্ডা। সেখানে অনেকে আসতেন। সৌমিত্র, দীপা, আশিস বর্মন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় আরও অনেকেই। আরেকটা মজার ঘটনা বলি। তখন সম্ভবত আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম। আমার কি দরকার ছিল কবিতা লিখবার জানিনা, বোধহয় সব বাঙালিই কোনও না কোনও সময়ে লেখে তাই লিখেছিলাম। বাবার বোধহয় সেটা ভালোই লেগেছিল। ‘রেকারিং ডেসিমাল’ নাম দিয়ে কবিতাটা লিখেছিলাম। তখন আমার দশ-এগারো বছর বয়স। বিষয়বস্তু হিসেবে সেই সময়ে ওটা যদিও পাকামি ছাড়া কিছুই ছিলনা। একদিন সুভাষ মুখোপাধ্যায় এসেছেন। বাবা সেই কবিতাটা আমাকে পড়তে বললেন। সুভাষ কাকা কবিতাটা শুনলেন। বাবাকে বললেন, “আপনার মেয়ের আর যাই হোক কবিতার সারবস্তু কিন্তু আছে। বেশিরভাগ কবিতার তো সারবস্তু বলে কিছু থাকেনা”। তারপর আমায় বললেন, “তুমি ছন্দ মিলিয়ে লেখনা কেন? গদ্য কবিতা লিখছ, অন্ত্যমিল দিয়ে লেখনা কেন?” আমার ভীষণ রাগ হল। আমি বাবাকে বললাম, তুমি যার তার সামনে আমাকে কবিতা পড়তে বলো না। বাবা তো যাকে বলে শকড্ হয়ে আমাকে বললেন, “যার তার সামনে মানে? তুই জানিস সুভাষ কতো বড় কবি?” তারপর সুভাষ কাকার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। তারপরে ওঁর লেখাগুলো বাবাই পড়ে শোনালেন প্রথমে। “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা”। তারপরে আমার একটা সুভাষ মুখোপাধ্যায় ‘ফেজ’ চলল। উনি যা লেখেন, আমি তাই পড়ি। আমার এই জিনিসটা ছিল। যা পেতাম হাতে, তাই পড়তাম।

প্রশ্ন: এটাতো বোধহয় আপনার এখনও রয়েছে?

অপর্ণা সেন: এখন আর কোথায় হয়? এখন এত রকমের ডিস্ট্র্যাকশন। ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, পডকাস্ট, টিভি।

প্রশ্ন: সবসময়ই কি চিদানন্দ বাবু ‘সিম্পল লিভিং’ ব্যাপারটায় বিশ্বাস করতেন?

অপর্ণা সেন: আমার বাবা-মায়ের একটা নন্দনবোধ ছিল। নন্দনবোধটা বেশি ছিল আমার মায়ের। কোনও রকম পয়সাকড়ির আড়ম্বর আমি আমার বাবা এবং মা কারো কাছেই দেখিনি। তবে খুব বেড়াতে যেতেন। হরিসাধন দাশগুপ্ত এবং সোনালী দাশগুপ্তের সঙ্গে বাবা-মা গিয়েছিলেন মণিপুরে। সেখানকার প্রিন্সেস বিনোদিনীর সঙ্গেও তারা দেখা করেছিলেন। তার ছবিও আছে। বিনোদিনী ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ আছে, মাঝে মধ্যে কথাবার্তাও হয়। স্বল্প টাকায়, ভারতবর্ষের মধ্যেই বেড়াতেন। কিন্তু যেতেন। আর যেখানেই বেড়াতে যেতেন সেখান থেকে কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। আমার কাছেও ব্যাপারটা অনেকটাই তাই। টাকা-পয়সা ইম্পর্ট্যান্ট, আমি জানি দরকার হয় কিন্তু আমারও ওই আড়ম্বরটা ভালো লাগেনা। তাও আমাদের মধ্যে এখন ব্যাপারটা অতটাও নেই, কিন্তু ওঁদের মধ্যে পুরোপুরি ছিল। তখন তো এখনকার মত এত এসি বা এটা ওটা ছিলনা। অবশ্য এত গরমও লাগত না।

প্রশ্ন: একসঙ্গে গান শোনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

অপর্ণা সেন: অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদেরকে ‘ইন্ট্রোডিউস’ করিয়ে দিতেন। আমার মনে আছে, পালুসকার তখন সবে ‘ঠুমক চলত্ রামচন্দ্র’ গেয়েছেন। আমার অথবা আমার মেজো বোন কারুর একজনের জন্মদিন। আমরা তিনজনে মিলে ম্যানশন পালিশ দিয়ে বাড়ির লাল মেঝে পরিস্কার করছি আর মা রান্না করছিলেন। গানটা চালিয়ে দিয়েছেন বাবা আর বলেছেন, “জানিস গানটা কে গেয়েছেন? পালুসকার”।

প্রশ্ন: আপনার বড় হওয়ায় বাবার অংশগ্রহণটা খুবই অন্যরকম ছিল তার মানে?

অপর্ণা সেন: একদম। কোনদিনও আমাকে ভাবতে হয়নি যে, আমি মেয়ে বলে কিছু করতে পারব না। আমাকে নিয়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্টও হয়েছে আমি প্রথম সন্তান বলে। তখন আমার বয়স ৪ বা ৫, বাবা একদিন আমাকে বললেন, “তুমি একজন স্বাধীন মানুষ। তুমি যা চাইবে, করতে পারবে”। আমি জানতে চাইলাম সত্যিই কিনা। বাবা বললেন, “নিশ্চয়ই। তোমার জীবনের সিদ্ধান্তগুলো তো তুমিই নেবে। অন্য কেউ নেবে কেন?” আমি বললাম, তাহলে আমি স্কুলে যাবনা। আমার এখনো মনে আছে, আমার মা তখন বাবা কে বলছেন, “দেখেছো, তুমি এইটুকু মেয়েকে এইসব কথা বলছো। এবারে বলছে কাল থেকে স্কুলে যাবে না। কি হবে?” তখন আমাকে বাবা বোঝালেন, স্কুলে না গেলে পড়াশোনা শিখতে পারবনা, রোজগার হবে না এইসব। কিন্তু কখনো বলতেন না যে বিয়ে করবে। আমিও কখনো ভাবতেই পারতাম না। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি করবে তুমি স্কুলে না গিয়ে?” আমি বলেছিলাম, কালী দিদির মতো ঘর মুছব। মা তো কেঁদে কেটে একসা। বাবাকে বললেন, “তুমিও যেমন। ওইটুকু মেয়ে, কি বোঝে স্বাধীনতার?” আমার তখন খুব কোমল মন ছিল। কাউকে কাঁদতে দেখলে আমি কেঁদে ফেলতাম। মায়ের কান্না দেখে আমি মাকে বললাম, তুমি কেঁদো না, আমি স্কুলে যাব। আসলে ওঁরাও তখন অনেক কিছু চেষ্টা করছিলেন আমাকে নিয়ে। ওঁদের তখনও বয়স ৩০-এর কোঠায় ঢোকেনি। বাবা আমার থেকে মাত্র ২৪ বছরের বড়।

প্রশ্ন: সেই জায়গা থেকে তো একটা সময়ের পরে একটা বন্ধুত্বের জায়গাও তৈরি হয়ে যায়?

অপর্ণা সেন: হ্যাঁ, বন্ধুত্ব তো ছিলই। মাঝেমধ্যে তর্কাতর্কি হত খুব। আমি যেহেতু খুব স্বাধীনচেতা ছিলাম, মাঝেমধ্যে আমার সঙ্গে বাবার ঝগড়াও লেগে যেত।

প্রশ্ন: কখনও আপনার সিনেমার চিত্রনাট্য উনি আগে থেকে পড়তেন?

অপর্ণা সেন: না, এটা পড়তেন না। অনেক সময় গল্পটা বলেছি বাবাকে। আমি ‘থার্টিসিক্স চৌরঙ্গী লেন’-এর চিত্রনাট্যটা দিয়েছিলাম পড়তে। কিন্তু উনি পড়েননি। তাই আমার খুব অভিমান হয়েছিল। মানিক কাকাকেও দিয়েছিলাম। মানিক কাকা পড়ে, যা যা বলার আমাকে বলেছিলেন। তারপর আমার বাবা আর আমার মেজোবোন রত্না দিল্লিতে ছবিটা দেখতে গিয়েছিল একটা স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে। বাবা খুব ভয় ভয়েই গিয়েছিলেন। ভাবছিলেন যে, কে জানে কি হয়েছে। আদৌ কোনও সিনেমা হয়েছে কিনা! সিনেমাটার একটা স্ট্যান্ডিং ওভেশন্ হয়েছিল। রত্না আমাকে বলেছিল, বাবার চোখটা তখন জলে ভিজে গেছে, মুখে হাসি আর ধরছে না।

প্রশ্ন: আপনার মত এত কাছ থেকে তো উনাকে আপনার মা ছাড়া আর কেউ দেখেননি। কখনো বাবাকে নিয়ে কোনও ডকুমেন্টারি বানানোর ইচ্ছে হয়নি?

অপর্ণা সেন: আসলে কেন ইচ্ছা হয়নি তার কারণটা হচ্ছে, আমি কিছু মেটেরিয়াল পাবোনা। কারণ, সেরকম ভাবে ভিডিও বা ক্লিপিংস বিশেষ কিছুই নেই। তাছাড়াও ডকুমেন্টারি আমি কতটা পারব তাও জানিনা। আমি তো কখন ডকুমেন্টারি বানাইনি, সবসময় ফিচার ফিল্মই বানিয়েছি।

প্রশ্ন: যদি বলি ‘লেগেসি ইজ্ সামথিং ইউ ইনহেরিট এন্ড কালচার ইজ্ সামথিং ইউ ডেভেলপ’। আপনার মতে কোনটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট? ‘লেগেসি ক্যারি ফরওয়ার্ড’ করা না ‘কালচার ডেভেলপ’ করা?

অপর্ণা সেন: দুটোই ইক্যুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট আমার কাছে। তুমি তোমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটা লেগেসি পেতেই পারো। কিন্তু তুমি যদি সেটাকে নার্চার না করো, চর্চা না করো তাহলে তো সেই জিনিসটাই শুকিয়ে যাবে। তাই দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে।

ছবি ©️ সৌজন্য: অপর্ণা সেন

UNIBANGLA AR

Loading

Spread the love