অতনু রায়

কলকাতা, মে ১২: আর কয়েক ঘন্টা পরেই মুক্তি পেতে চলেছে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ছবি ‘অপরাজিত‘। সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে বড়পর্দায় দেখা যাবে ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির নেপথ্য কাহিনী। ছবি মুক্তির আগেই পরিচালক অনীক দত্ত (Anik Dutta) কথা বললেন খোলামনে।

প্রশ্ন: অনীক দা, ‘অপরাজিত’ আমাদের দেখাবে ‘পথের পাঁচালী’ ছবি বানানোর পথে সত্যজিৎ রায়-এর ‘স্ট্রাগল’। ‘অপরাজিত’ বানাতে গিয়ে আপনার কাছে সব থেকে কঠিন বা বড় ‘স্ট্রাগল’ কি ছিল?

অনীক: এখানে আমি একটা কথা বলব, আমার মনে হয় ‘স্ট্রাগল’ দু’রকমের হয়। একটা যেটায় ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’ লঙ্ঘিতে হয়, আরেকটা মানসিক ‘স্ট্রাগল’। মানসিক স্ট্রাগল অবশ্য সমস্ত কাজেই থাকে। আর কঠিন বলতে গেলে, বিষয়বস্তুটাই কঠিন। কঠিন এই কারণে যে, ‘হোলি কাউ’ বলে একটা কথা আছে আর আমাদের এখানে বেশ কিছু ‘হোলি কাউ’ আছে। রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায় তার মধ্যেই পড়েন।

প্রশ্ন: এই ‘হোলি কাউ’ ব্যাপারটা তো আমাদের সবসময়ই আছে!

অনীক: হ্যাঁ, তাই আমি নিজে সত্যনিষ্ঠ থেকে এবং সততার সঙ্গে কাজটা করি সবসময়। তারপরে যদি কোনও জায়গায় আমার অক্ষমতা থাকে, মানুষ নিশ্চয়ই সেটা বলবেন। তাতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।

প্রশ্ন: আপনি জীতু কামাল-কে নিয়ে ছবিটা করলেন। জীতুকে দেখে মানুষ ভাবলেন ও সত্যিই বুঝি সত্যজিৎ! কিন্তু আপনি জীতুর কাছ থেকে কতটা চাইলেন আর কতটা পেলেন?

অনীক: আমি যতটা আশা করেছিলাম তার থেকে অনেক বেশিই পেয়েছি। একটাই কথা বলতে চাই, জীতু আমাকে অবাক করে দিয়েছে। জীতুর সঙ্গে আমি খুব বেশি সময় পাইনি। তা সত্ত্বেও নিজের চেষ্টায় ও যে অভিনয়টা করেছে, তাতে আমি বেশ অবাকই হয়েছি।

প্রশ্ন: সবদিক বিবেচনা করে দেখলে খুব কঠিন একটা ছবি ‘অপরাজিত’। এই ছবি বানানোর জন্য অন্যরকম কনফিডেন্স বা আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন হয়। পরিচালক অনীক দত্ত কি খুব কনফিডেন্ট?

অনীক: আমি বলব আমি ‘ওভার-কনফিডেন্ট’ একেবারেই নই বরং আমি খুব ‘স্কেপটিক্যাল’। তবে বাবু দা (সন্দীপ রায়) যখন আমাকে ছবিটা করার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দিলেন, তখন যেটাকে ‘সেলফ্-ডাউট’ বলে সেটাও কিন্তু আমার তেমন হয়নি। যদিও আমি ভাবছিলাম যে, আমি নিজে নিজেই এটা আমার ঘাড়ে নিলাম! তারপরেই আমার মনে হল, এটা করা যাবে। আসলে আমি আগেই অনেক ভাবনা চিন্তা, রিসার্চ করে প্রস্তুতি নিই। যখন আমার মনে হয় আমি প্রস্তুত, তখনই আমি সিরিয়াসলি গিয়ে বলি বাবু দাকে। কারণ বায়োপিক হোক আর নাই হোক মানুষ সব বুঝতেই পারবেন কারণ, এর মধ্যে কোনও লুকোচুরি নেই। অন্ততপক্ষে এটা যে সত্যজিৎ রায়ের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত সেটা মানুষ বুঝতেই পারবেন। আমি নিজের মতো করে করেছি তারপরে যাকে বলে ‘কে সেরা সেরা’ (que sera sera), মানে, যা হয় হবে ভেবে ছেড়ে দেওয়া। আমার এই জায়গা থেকে কনফিডেন্সটা বেড়েছে অনেকগুলো কারণে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে জীতুকে খুঁজে পাওয়া। চেহারার সাদৃশ্যর ব্যাপারটা তো আছেই, অভিনয়ের সময়ও দেখলাম যে ওকে খুব বেশি বলতে হচ্ছে না।

প্রশ্ন: মানুষ বুঝতে পারবেন বলছেন, সন্দীপ রায়ের অনুমতিও নিয়েছেন। তাহলে ছবিটাকে বায়োপিক হিসেবে না বানিয়ে চরিত্রগুলোর নাম বদলে দিলেন কেন?

অনীক: বায়োপিক কেন করলাম না বা কেন নামগুলো বদলে দেওয়া হল তার পিছনে অন্য একটা কারণ রয়েছে। এটা ঠিকই যে আমি এইখানে ‘আপন মনের মাধুরী’ মেশাই নি। তবে কিছু কিছু কিছু ব্যাপার নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা হয়েছে। সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে এরকম অনেক তথ্য বা গল্প হয়তো আমরা পেয়েছি যা কথায় কথায় চলে এসেছে কিন্তু সেগুলো কোথাও সেভাবে লিপিবদ্ধ নেই। যেমন, যখন উনি চাকরি ছেড়ে ছবি বানানোর কথা ভাবছেন সেই সময়ে বাকিদের সঙ্গে কি কথা হচ্ছে সেই কথাটা তো আমরা জানতে পারছি না। সেই কথাগুলো কিন্তু ধরে নিতে হবে। হয়ত কোনো রেফারেন্স থাকতে পারে, আবার এটাও ঠিক যে তিনি নিজে ডাইরি লিখে গেলেও সংলাপগুলো তো লিখে যাবেন না। এই সমস্ত ছবির ক্ষেত্রে তাই কিছু বিষয় থিমটাকে ভেবে নিয়ে করতে হয়, কারণ একজন মানুষ কখন, কোথায় বসেছিলেন বা দাঁড়িয়েছিলেন সমস্ত কিছু লেখা অবস্থায় পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন: এই কারণেই সত্যজিৎ রায় হলেন অপরাজিত রায় আর তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পদাবলী’?

অনীক: হ্যাঁ। এইটা অবশ্য আমি আর বাবু দা একসাথেই ঠিক করেছিলাম যে আমরা নামটা বদলে দেব।

প্রশ্ন: এর মাধ্যমে কি পরবর্তীতে দর্শকদের বিতর্ক তৈরির জায়গা থেকেও বিরত রাখা গেল?

অনীক: আমরা যদি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘সেই সময়’ পড়ি, তিনি তো রিসার্চের কোনও খামতি রাখেননি। বহুবার তিনি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে রিসার্চ করেছেন কিন্তু তার পরেও কিন্তু কিছু জিনিস নিজের মত করে লিখতে হয়েছে। সেটা না হলে তো একটা ডকুমেন্টারি বা ডকুমেন্টেশন হয়ে যাবে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঝুঁকি নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন যেটা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে, কিন্তু অতটাও হয়নি। আমাদের এখানে ছবিতে কিছু ঘটলেই মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারণ, বই সম্পূর্ণ আলাদা একটা মাধ্যম। বই নিয়ে সমালোচনা করতে গেলে আগে তো সেটা পড়তে হবে! একটা ছবি দু’ঘণ্টা ঠাণ্ডা ঘরে বসে দেখে ফেলার থেকে ‘সেই সময়’ বা অন্য কোনও বই পড়াটা অনেক সময়সাপেক্ষ। সেই জন্য এখানে ‘ফিল্ম’ বরাবরই ‘সফটার টার্গেট’।

প্রশ্ন: সত্যজিতের ছবিতে সঙ্গীত একটা স্তম্ভ। আপনার ছবিতেও সঙ্গীত বরাবর একটু অন্যভাবে এসেছে। এই ছবির সঙ্গীতের ক্ষেত্রে আপনার সঙ্গীত ভাবনাকে কতটা বদলাতে হয়েছে?

অনীক: ঠিক বদলাতে হয়েছে বলব না। আসলে সঙ্গীত নিয়ে আমার নিজের একটা ভাবনা থাকে। এবার সত্যজিৎ রায়ের ছবির সঙ্গীত নিয়ে বেশ কিছু প্রামাণ্য কাজ আছে। উৎপলেন্দু চক্রবর্তী একটি ডকুমেন্টারিও বানিয়েছেন। আমার সঙ্গে যিনি কাজ করছেন দেবজ্যোতি মিশ্র, তিনি তো শুধুমাত্র একজন সঙ্গীত পরিচালক নন, তিনি সঙ্গীতের একজন স্কলার। দেবজ্যোতি আর আমি দুটো জিনিস মাথায় রেখেছি। প্রথমত উনি কোন ধরণের মিউজিক বেশি শুনতেন আর দ্বিতীয়ত ‘পথের পাঁচালী’র মিউজিক। কপিরাইটের কোনও সমস্যা হত কিনা জানিনা তবে আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, পথের পাঁচালীর মিউজিক আমরা রি-ক্রিয়েট করব না কিন্তু তার একটা আভাস রাখতে হবে।

প্রশ্ন: ব্যক্তি সত্যজিৎ থেকে বাইরে গিয়ে যদি জানতে চাই অনীক দত্ত’র কাছে ‘পথের পাঁচালী’র গুরুত্ব কতটা?

অনীক: আমি বলব, ‘পথের পাঁচালী’ একদিকে যেমন সত্যজিৎ রায়ের স্ট্রাগলের ফসল, তেমনই সত্যজিৎ রায়ের ‘হোমকামিং’। এই ছবি সত্যজিতের ঘরে ফেরা। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন ইংরাজিতে লিখতে লিখতে একটা সময়ে নিজের ভাষায় ফিরেছিলেন, সত্যজিৎ রায়ও তাঁর হলিউডের ছবি দেখা, বিদেশী বই পড়া থেকে প্রথমবার নিজের বাংলায় ফেরেন। সেই ফেরাটাই ‘পথের পাঁচালী’। তার আগে তিনি সেরকমভাবে বাংলা সিনেমাকে গুরুত্ব দেননি, হয়ত তুচ্ছ তাচ্ছিল্যও করেছেন। এরপর ছবিটা বানাতে গিয়ে একবছর আটকে যাওয়া হয়ত ‘ব্লেসিং ইন ডিসগাইজ্’ ছিল। তিনি নিজেই বলেছেন যে সেই সময়ে তিনি বংশী বাবুকে নিয়ে পল্লীগ্রাম বিষয়ে আরও বেশি করে জেনেছেন, বুঝেছেন।

আমি আমার ছবিতেও রেখেছি যে, সত্যজিৎ রায় যখন ছোটবেলায় শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ ‘এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে’ বলে লিখে দিয়েছিলেন, “বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে/বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,/দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।/দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শিষের উপরে/একটি শিশিরবিন্দু”। পরে এই জিনিসটাই হয়ত তাঁর মনে এসেছিল। এর সঙ্গে যোগ হল বিভূতিবাবুর লেখায় ছবির মত গ্রামের বর্ণনা। যত পড়েছেন ততই ব্যাপারটা ওঁর কাছে একটু অন্যভাবে উন্মোচিত হয়েছে। তাই হয়ত ‘পথের পাঁচালী’। নাহলে উনি তো প্রথমে ‘ঘরে বাইরে’ করবেন ভেবেছিলেন। হয়ত উনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ছবিটা করলে খুব ‘অরিজিন্যাল’ একটা ছবি হবে। আর উনি জানতেন নিশ্চয়ই যে, যত ‘অরিজিন্যাল’ হওয়া যাবে তত আন্তর্জাতিক হওয়া যাবে।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম ছবি ‘ভুতের ভবিষ্যত’-এ আমরা দেখেছিলাম সংলাপ খুব অন্ত্যমিলের ছন্দে ছন্দে এসেছে। সেই সংলাপের মাধ্যমেও কি ‘হীরক রাজার দেশে’র সত্যজিতকে শ্রদ্ধা জানানো ছিল?

অনীক: না। ওটা যে আমি শ্রদ্ধা জানাব বলে লিখেছিলাম তা কিন্তু নয়। ওটা আমি আমার মত করেই করেছিলাম। কিন্তু ছবিটা মুক্তি পাওয়ার পর থেকে মানুষ বলতে শুরু করে এর মধ্যে সত্যজিৎ রায়ের ইনফ্লুয়েন্স রয়েছে।আমি অত পড়াশোনা করি না, সিনেমা নিয়ে যে প্রচুর পড়াশোনা করেছি তাও নয়। তাই জ্ঞানত, কোথাও থেকে খুব ‘ইনফ্লুয়েন্সড’ হয়েছি তেমনটা একেবারেই নয়। তবে ছোটবেলা থেকেই সত্যজিৎ রায়ের লেখা পড়া, ‘সন্দেশ’-এর গ্রাহক হিসেবে তাঁর আঁকা ছবি দেখে আঁকার চেষ্টা করা ছিল তো বটেই।

প্রশ্ন: ‘ইনফ্লুয়েন্স’ কি একেবারেই নেই তবে?

অনীক: সত্যজিৎ রায় একমাত্র মানুষ যাঁর সব ছবি আমি দেখেছি। শুধু ছবি কেন, তাঁর লেখা, প্রচ্ছদ, আঁকা, বিজ্ঞাপনের আঁকা, সমস্ত কিছুই আমি বিভিন্ন স্তরে দেখেছি। তাই মনের মধ্যে ‘ইনফ্লুয়েন্স’ থেকে যেতেই পারে এবং সেটার জন্য আমি একেবারেই ‘অ্যাপোলোজেটিক’ নই। কারণ আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু টুকলি তো করছি না, আমার কাজের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণই আলাদা।

আমি অনেক ছবি দেখেই উদ্বুদ্ধ হয়েছি। সেই তালিকায় এম এস সত্থ্যুর ‘গরম হাওয়া’ যেমন রয়েছে তেমনই অপর্ণা সেনের ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গী লেন’ রয়েছে। কিন্তু এটাও সত্যি যে সত্যজিৎ রায় না থাকলে আমি আদতে ছবি করতে আসতাম কিনা সেটাই একটা সংশয়, তাই তাঁর একটা ইনফ্লুয়েন্স তো থাকতেই পারে। আমি কখনও সেটাকে আটকানোর চেষ্টাও করিনি।

Loading

Spread the love