অতনু রায়

কলকাতা, অগাস্ট ৯: ১১ অগাস্ট মুক্তি পাচ্ছে তাঁদের জুটির নতুন ছবি ‘হত্যামঞ্চ’। তাঁরা দুজন খোশমেজাজেই থাকেন কারণ দর্শক তাঁদের জুটি পছন্দ করেছেন অনেক আগেই। দর্শক যাঁদের জুটিতে পছন্দ করেছেন, আমরা তাঁদের সঙ্গে আলাদা বসি কি করে? তাই একসঙ্গে ব্যোমকেশ-সত্যবতী। এসভিএফ আর ক্যামেলিয়া প্রডাকশনের যৌথ প্রযোজনায়, অরিন্দম শীলের ‘ব্যোমকেশ হত্যামঞ্চ’ মুক্তির আগেই একান্ত আড্ডায় আবীর চট্টোপাধ্যায় এবং সোহিনী সরকার

প্রশ্ন: আবীরকে দিয়েই শুরু করতে হবে, কারণ ব্যোমকেশকে দিয়েই শুরু করতে হয়…

আবীর: কেন? না, না, এরকম কোনো নিয়ম নেই…

প্রশ্ন: আরে না, না! ব্যোমকেশকে দিয়ে শুরু না করলে বাঙালি প্রচন্ড রেগে যাবে।

প্রশ্ন: মুম্বইতে একটা দুর্দান্ত ছবির কাজ করে আবার তুমি বাংলা ছবি নিয়ে বড় পর্দায়। যখন ব্যোমকেশ আসে, তখন কি একটা আলাদা রকমের অনুভূতি কাজ করে?

আবীর: সবসময়ই একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়ে এসেছে, এবারেও হয়েছে। আমার পথ চলা শুরু বা দর্শকদের কাছ থেকে যেটুকু যা ভালবাসা আমি পেয়েছি তার শুরু ব্যোমকেশ দিয়ে। ব্যোমকেশ সেই কারণেই স্পেশ্যাল হয়ে থাকবে। আমি নিজেও ব্যোমকেশের ফ্যান, আমি ব্যোমকেশ পড়েছি, খুব ভাল লেগেছে। এটা আমার সাত নম্বর ব্যোমকেশ, আর যদি ‘বিদায় ব্যোমকেশ’ ধরি তাহলে আট নম্বর। এরকম একটা আইকনিক চরিত্রের সঙ্গে মানুষ আমাকে আইডেন্টিফাই করেন এবং সেই কারণে ব্যোমকেশের একটা আলাদা স্থান সবসময়ই ছিল, আছে আর থাকবে। এই কারণেই দায়িত্ব বল বা দায়বদ্ধতা সেটাও অনেক বেশি। আর মজার বিষয় যেহেতু তুমি হিন্দি কাজ ‘অবরোধ ২’ এর কথা বললে, ওটা রিলিজ করেছিল যখন আমরা ব্যোমকেশ শুট করছি তখন। তার মাঝখানে আমাকে দু-তিনদিন বাইরেও যেতে হয়েছিল প্রমোশনে। যখন আমরা ব্যোমকেশের শেষের দিকটা শুট করছি মানে তখন আরও চার-পাঁচ দিনের মতো শুটিং বাকি, তখন ট্রেলার লঞ্চ করল। তারপর ঐ সময়টাতে রিলিজও হল সিরিজটা। আমার মনে আছে, শুটিং চলছে আর আমি দেখার চেষ্টা করছি যে স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে কিনা। আমার মনে হয় যে কোথাও গিয়ে এভরিথিং ইজ্ কানেক্টেড।

প্রশ্ন: সোহিনী, তোমারও পরপর বেশ কয়েকটা ভাল কাজ হল ওটিটি বড় পর্দা মিলিয়ে। এই অন্যরকমের কাজগুলো করতে করতে যখন একটা ফ্রাঞ্চাইজি ছবিতে ফেরো তখন তো চরিত্রের অনেক ম্যানারিজম ক্যারি ফরওয়ার্ড করতে হয়। শুটিং শুরুর আগে কি নিজের পুরোনো কাজগুলোকে আরেকবার ঝালিয়ে নাও?

সোহিনী: না, আমি ঝালিয়ে নিই না। কারণ, যে কাজটা আমি করছি সেটা এমনিতেই মাসল্ মেমোরিতে থেকে যায়। এইটা নিয়ে আমরা চার নম্বর ব্যোমকেশ করেছি, তো যেই মুহূর্তে আমি ফ্লোরে গেলাম আর ওই কস্টিউমটা পরলাম, আবিরদা সামনে আর অরিন্দমদা মনিটরের সামনে তখন দেখলাম যে পুরো ব্যাপারটাই আমি ফিরে পেলাম। আমাকে কোনও বেগ পেতে হল না। এবারে বাকিটা তো দর্শকরা বলবেন যে কতটা সঠিক ভাবে করলাম।

প্রশ্ন: তোমার কি মনে হয়, কতটা হল?

সোহিনী: ইনফ্যাক্ট আমার মনে হল, যে আগের সত্যবতী করতে গিয়ে সেটা আমার বয়সের জন্যই হোক বা অভিজ্ঞতার জন্য, অনেকক্ষেত্রে আমার নিজেকে আড়ষ্ট লেগেছে। এরকম অনেক ক্ষেত্রে এর আগের সত্যবতীকে দেখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে এই জায়গাটায় হয়ত একটু বেশি ন্যাকামি করে ফেলেছি, এত বেশি ন্যাকা সত্যবতী নয়। একটা জায়গায় মনে আছে যে মুসৌরিতে শুট করছি, আমরা একটা ক্যাফেতে বসে ওয়াফল্ খাচ্ছি যেটা আমার কাছে একটা নতুন খাবার আর কি। সেখানে আমি এমন একটা এক্সপ্রেশন দিয়েছি যে সেটা এখন দেখলে নিজেকে এত বিরক্ত লাগে! মুখ-টুখ বাঁকিয়ে এমন একটা জিনিস করেছি যে সেইখানে আমার আমিটা মানে সোহিনীর আমিটা বেরিয়ে এসেছে। বরং এবারে আমার মনে হল যে আমি অনেকগুলো জায়গা অনেক বেশি ন্যাচারাল করলাম। হয়তো চার বছর পরে এটা দেখতে গেলেও মনে হবে যে না, এটাও হয়ত হয়নি। ২০১৫ তে যখন ‘হর হর ব্যোমকেশ’ করেছিলাম তখন আমাদের দুজনেরই অনেক কচি মুখ ছিল, ছেলেমানুষিটাও ছিল মুখের মধ্যে। সেটা এখন দেখতে ভাল লাগে কিন্তু অনেক জায়গায়ই মনে হয় এটা ঠিক হয়নি, এটা ভাল হয়নি বা এরকম হলে ভাল হত।

প্রশ্ন: ব্যোমকেশ এমন একটা ছবি যেখানে অনেক নারী চরিত্র আছে যেটা কিন্তু আমরা অন্যান্য গোয়েন্দা গল্পে খুব একটা পাই না। সত্যবতী হিসেবে লক্ হয়ে যাওয়ার পরে ব্যোমকেশের অন্য কোনও নারী চরিত্র দেখে মনে হয়েছে যে ইশ্, যদি সত্যবতী না হতাম তাহলে এই চরিত্রটা করতে পারতাম?

সোহিনী: হ্যাঁ, হ্যাঁ, একদমই একদমই! এই বিষয় নিয়ে আমি একদমই অকপট, মিথ্যে বলার কোনও জায়গা নেই। আমাকে যখন প্রথমবার সত্যবতী করবার জন্য বলা হয়েছিল তখন আমি ভেবেছিলাম সত্যবতী হতে তো বলছে তার মানে অনেকগুলো ব্যোমকেশ আমি থাকব কিন্তু অন্য যে নারী চরিত্রগুলো যেগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং, অনেকগুলো শেডস্ রয়েছে, কোনোটায় হয়ত নেগেটিভ শেডস্ রয়েছে, সেগুলো তো আমার করা হবে না সেটাও আমার মনে হয়েছে। কিন্তু এখন সত্যবতী হিসেবে আমি যে জনপ্রিয়তাটা পেয়েছি বা পরিচিতিটা পেয়েছি, সেটাও তো ফেলে দেবার মত নয়। একজন অভিনেতা হিসেবে এটাও আমার কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব রাখে। কোনোটাই আমি ফেলে দিতে পারি না, দুটোরই লোভ আছে মনে হয়। ওই বলে না, গাছেরও খাবে আবার তলারও কুড়োবে! তেমনই সত্যবতীও হব আবার ওই চরিত্রগুলোও করব (হাসি)।

প্রশ্ন: সেই দিক থেকে দেখতে গেলে অরিন্দম শীলের বানানো ব্যোমকেশ গুলোর মধ্যে অন্য কোন নারী চরিত্র সবথেকে লোভনীয় মনে হয়েছে?

সোহিনী: ‘হর হর ব্যোমকেশ’-এ শকুন্তলা চরিত্রটা যেটা নুসরত করেছিল, খুব ইন্টারেস্টিং না চরিত্রটা?

প্রশ্ন: হ্যাঁ, এবারে পাওলির চরিত্রটাও কিন্তু খুব ইন্টারেস্টিং।

সোহিনী: হ্যাঁ, পাওলি দি’র চরিত্রটাও খুব ইন্টারেস্টিং। পাওলি দি অসম্ভব ভাল অভিনেত্রী, বাচনভঙ্গি খুব সুন্দর আর অভিনয়টা করেছেও দারুণ।

প্রশ্ন: বাংলায় প্রচুর ব্যোমকেশ। যত ব্যোমকেশ ততজন ব্যোমকেশ। ভেতরে ভেতরে কি কোনও কম্পিটিটিভ মাইন্ডসেট কাজ করে?

আবীর: না, এখন আর করে না।

প্রশ্ন: আগে করত?

আবীর: ২০১৫ তে যখন নতুন করে অরিন্দম দার সঙ্গে আবার ব্যোমকেশ করছি তখন প্রথম দিকে একটু মনে হতো এখন আর হয় না।

প্রশ্ন: তখন কি মনে হত?

আবীর: কোথাও একটা মাথায় চলত যে কি হচ্ছে – কেন হচ্ছে, এ রকম আর কি! কিন্তু এখন সিরিয়াসলি সেটা আর নেই। এটা কিন্তু শুধু এই কারণে নয় যে আই অ্যাম কনফিডেন্ট অ্যাবাউট মাই ব্যোমকেশ, অ্যাবাউট আমাদের ব্যোমকেশ, বরং বয়স আর অভিজ্ঞতার কারণে আমার মনে হয়েছে এমন অনেক কিছু ঘটনা রয়েছে যেটা হয়ত আমার কন্ট্রোলে নেই। তাই নিজের কাজে মনোযোগী হওয়াটাই সবথেকে ভাল।

প্রশ্ন: এই গল্পটা শেষ করেছেন অরিন্দম শীল এবং পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। মানুষ তো অসমাপ্ত গল্পের অল্টারনেটিভ এন্ডিং ভাবে। আমরা তো কেউই এবারে জানিনা কে খুনি। ছবির খুনি আর তোমার মনের ভাবনার খুনি, দুজন কি এক?

আবীর: দেখো, এটা একটা প্রপার ‘হু ডান ইট’। যতই তুমি ফেলুদা বা ব্যোমকেশ-এর ক্ষেত্রে ‘হু ডান ইট’ কর লোকে জানে কেন ক্রাইমটা হয়েছিল বা কে করেছিল। এবার কিছু ‘ট্যুইস্ট অ্যান্ড টার্নস’ থাকে যেটা আমাদের আগের তিনটে ব্যোমকেশেও ছিল, কিন্তু এইটা একটা প্রপার ‘হু ডান ইট’। এক্ষেত্রে আমরা কেউই জানিনা কে বা কারা ক্রাইমটা করেছে। আমরা প্রত্যেকেই, বিশেষ করে অরিন্দম দা এবং পদ্ম দা ব্যোমকেশ পড়েছি, আমরা ব্যোমকেশ বিভিন্ন ভাবে ইন্টারপ্রেট করেছি। বিটুইন দ্য লাইনস্ অথবা অন্যান্য গল্পের রেফারেন্স থেকে ব্যোমকেশকে কিভাবে এক্সপ্লোর করা যায় সেগুলোও করেছি। তাতে আমাদেরও মনে হয়েছিল যে, ‘বিশুপাল বধ’ যেটুকু শরদিন্দু বাবু লিখেছেন তাতে এই চরিত্রগুলো এইভাবে কেন লিখলেন, এই প্রিমাইসটা তিনি কেন বাছলেন! তার একটা সম্ভাব্য কারণ ধরে নিয়ে গল্পটাকে সেইভাবে শেষ করা হয়েছে। এবার দর্শকদের দ্বিমত থাকতেই পারে। একটা অসম্পূর্ণ গল্প পড়ে এটা হয়তো এরকম হত ভেবে নেওয়ার একটা আলাদা স্বাধীনতা প্রত্যেকের আছে আর সেটাই কিন্তু মজা। অন্যান্য গল্পের তুলনায় এই গল্পটা ওই জায়গা থেকে একদমই আলাদা। তবে তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞাসা কর আমি এরকমই ভেবেছিলাম কিনা, সেটা বলা খুব মুশকিল। যখন গল্পটা পড়েছিলাম, তখন যে সেভাবে মনে হয়েছে তা নয়। বরং যখন গল্পটা নিয়ে প্ল্যান হয়েছে যে ‘বিশুপাল বধ’ হবে তখন থেকে আমি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছি পদ্ম দা আর অরিন্দম দার উপর। আমি ওইটাই দেখতে চেয়েছিলাম যে তাঁরা কিভাবে গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে যান। ব্যোমকেশ তো শুধুমাত্র একটা খুনির গল্প নয়, সেটা কোনদিনই ছিল না এবং অরিন্দম দার ট্রিটমেন্টে আরওই ছিলনা।

প্রশ্ন: এখানে কি কি পাওয়া যাবে আর?

আবীর: এই সময়টা। ১৯৭০-৭১ সাল, নকশাল আন্দোলন, তার কি প্রভাব, সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি কিভাবে বদলে যাচ্ছে, মানুষ সেটা কিভাবে দেখছে, মানুষের হাব-ভাব-আচার-আচরণ-দৃষ্টিভঙ্গি কিভাবে বদলে যাচ্ছে এবং সব থেকে বড় কথা যে ব্যোমকেশ আর সত্যবতীর সম্পর্কের একটা ম্যাচিউরিটি হয়েছে। আমরা সত্যবতীকে এই ছবিতে সন্তানসম্ভবা হিসেবে দেখছি। একটা পরের জেনারেশন, একটা সন্তান আসার আগে মানুষ যেন একটা বড় ধাপ পেরোয়। তখন তাদের মনে হয় যে এবারে আমাদের বেঁচে থাকাটা শুধু আমাদের জন্য নয়, এটা কিন্তু একটা বিশাল দায়িত্বের জায়গা যে একটা নতুন প্রাণ আসছে আমাদের দায়িত্বে। কারণ, সে তো আসতে চায়নি, আমাদের ভালবাসার ফল হিসেবে সে আসছে। সেখানে দাঁড়িয়ে এরা দুজন কিভাবে দেখছে এই টালমাটাল সময়টাকে বা তারা কতটা কনফিডেন্ট এবং কিভাবে এগোয় সেটাও আছে এই গল্পের মধ্যে। তার সঙ্গে প্রফেশনাল থিয়েটার আর কোথাও তার একটা অবক্ষয়, সেটা কিভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাচ্ছে সেটাও আছে।

প্রশ্ন: থিয়েটারের মঞ্চ এখানে খুব বেশি করে আছে। বাংলা থিয়েটারের এই মুহূর্তে খুব ভাল জায়গায় দাঁড়িয়ে, তেমনটা নয়। কিছু খুব ভাল প্রোডাকশন হয়ত হচ্ছে কিন্তু প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বড় পর্দার পরিচিত মুখ দিয়ে নাটক চালাতে হচ্ছে। তোমাদের কি মনে হয় যে আরো বেশি করে বড়পর্দার মুখ নাটকের মঞ্চে দেখতে পাওয়া দরকার?

আবীর: হ্যাঁ, সোহিনী তো করছেই। তাই এক্ষেত্রে ওর উত্তরটা একরকম হবে আর আমার আরেক রকম হবে।

প্রশ্ন: হ্যাঁ, সোহিনী তো করেই…

সোহিনী: দেখো, আমি যবে থেকে অভিনয় করতে এসেছি আমার ক্ষেত্রে সবকিছু একটু উল্টো হয়েছে। আমি আগে সিরিয়াল করেছি, তারপরে আমি থিয়েটার করেছি, সেটা আমার ইচ্ছেতেই। এমন নয় যে আমার থিয়েটারের ছাত্রী হিসেবেই কাজ করা। আমার সমকালীন যেসব অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কাজ করছেন তাদের অনেকেই আছেন যাঁরা থিয়েটার করেই এসেছেন এমনকি পড়াশোনাও করেছেন থিয়েটার নিয়ে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। আমি টেলিভিশন করে থিয়েটার করা শুরু করেছি কারণ আমার মনে হয়েছে থিয়েটার আমার চর্চার একটা জায়গা। আমি তো ছোটবেলা থেকে সেভাবে অভিনয় শিখে বড় হইনি, সেখানে আমার একটা শেখার জায়গা তৈরী হওয়া উচিত আর আমি থিয়েটারকে বেছে নিয়েছি। পরবর্তীকালে আমি ছবি করতে শুরু করেছি এবং থিয়েটারটাও সমানভাবে করা শুরু করেছি। আমি প্রচুর থিয়েটার দীর্ঘদিন ধরে দেখেছি।

প্রশ্ন: কি মনে হয়েছে থিয়েটার নিয়ে?

সোহিনী: আমার এখনও যেটা মনে হয় সেটা শুনলে অনেকেই হয়তো রে রে করে তেড়ে আসতে পারেন আবার অনেকে একমত হতেও পারেন। আমার মনে হয়, থিয়েটারে যে বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ হয় সেটা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলা ছবিতে বর্তমানে যেসব বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি উন্নত এবং স্মার্ট। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি বলব আমি কিছুই জানিনা। থিয়েটারের ক্ষেত্রে আমি এখনও নতুন। আমি সবার থেকে শুনি, বোঝার চেষ্টা করি। এটা আমি বুঝতে পারি যে থিয়েটারের রাজনীতিটা আলাদা। প্রত্যেকটা ইন্ডাস্ট্রির একটা আলাদা রাজনীতি হয়। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে আমি যেমন অনেকটা অবগত, থিয়েটার সম্পর্কে সেভাবে জানিনা। আমি থিয়েটারেরটা শুনি, কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি যে দুটো প্রোডাকশনের কাজ করছি তার মধ্যে একটা হচ্ছে ‘অথৈ’ যার পরিচালক অর্ণ মুখোপাধ্যায় যিনি আমাদের এই ব্যোমকেশেও আছেন। ‘ওথেলো’র একটা অ্যাডাপটেশন ‘অথৈ’ যখনই হয় যত টাকার টিকিটই হোক না কেন হাউসফুল হয়। দলের শো হলে অবশ্যই কম টাকার টিকিট হয় কারণ অর্ণরা বেশি টাকার টিকিটে বিশ্বাসী নয়। আবার আমরা যখন কোনও ফেস্টিভ্যালে যাই তখন তাঁরা অনেক বেশি টাকার টিকিট রাখেন কিন্তু তার পরেও দেখেছি যে শোগুলো সব হাউসফুল। আগামী ১৯ অগাস্ট আমাদের পঞ্চম বৈদিকের একটা শো আছে, সেখানেও কিন্তু ইতিমধ্যেই হাউসফুল। অ্যাকাডেমিতে দর্শকরা মাটিতে বসেও অথৈ দেখেছেন।

প্রশ্ন: তোমাকে বলি, সম্প্রতি আমি বাংলাদেশের একজন নাট্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ভদ্রমহিলা এসেছিলেন বহরমপুরে একটা শো করতে। তারপরে একরাত্রি বাস জার্নি করে কলকাতায় এসেছিলেন শুধু ‘অদ্য শেষ রজনী’ নাটকটা দেখবেন বলে। তিনি কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন যে বাংলাদেশে মানুষের কাছে ‘অথৈ’র একটা আলাদাই গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

সোহিনী: একদমই। এটার অনেকটা ক্রেডিট কিন্তু অর্ণর। যারা থিয়েটার করতে আগ্রহী আমি সবাইকেই বলি যে, অর্ণর সঙ্গে একবার কাজ করা উচিত। ও একজন দারুণ ট্রেনার, দারুণ পরিচালক। আমি অর্ণর আরেকটা নাটকও করি, ‘মহাভারত’। সেখানে আমি দ্রৌপদী চরিত্রে। ‘অথৈ’র মত না হলেও যথেষ্ট ভাল গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে মহাভারত নাটকটারও। মনে আছে, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকটা কয়েক বছর আগে যখন ব্রাত্য (বসু) দা উইথড্র করে নিলেন আমার এত মন খারাপ হয়েছে! আমি শেষ শোটাও দেখতে গেছি, ‘কাকাতুয়া’ বলে বহুরূপীর একটা নাটক সেটা আমি দেখেছি চার-পাঁচবার। এরকম অনেক নাটকই আছে যা আমি বহুবার দেখেছি। তারপর ‘কোজাগরী’ বলে সম্প্রতি একটা প্রোডাকশন হয় বেলঘড়িয়া অভিমুখের। তাই আমার মনে হয় এই মুহূর্তে ছবিতে যা কাজ হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হচ্ছে থিয়েটারে। কিন্তু থিয়েটারের কিছু লিমিটেড দর্শক আছেন, তুমি যেটা বললে ঠিকই কিছু কিছু মুখের জন্য মানুষ আসেন…

প্রশ্ন: …হ্যাঁ, তারা হয়ত সোহিনীকে দেখতে যায়, অনির্বাণকে দেখতে যায় কিন্তু নাটকের যাঁরা দিকপাল অভিনেতা তাদের কাজ দেখতে যাচ্ছেন না…

সোহিনী: …এবং জানেনও না। মিডিয়াও সেভাবে সেলিব্রেট করে না। নাটকে এমন সব দারুণ দারুণ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আছেন, আমরা ক’জনের নাম জানি! একটু আগেই আবীর দা বলল, অবক্ষয়; আসলে অনেক কিছুই আমরা আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলেছি। আমরা তার জন্য নিজেরাই দায়ী। আমরা সারা জীবনই আমাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অন্যেরটা কপি করার চেষ্টা করেছি আর আমাদের নিজেদের যে মাটি সেটাকে আমরা সবসময় অস্বীকার করেছি। আমরা কোনদিন সেটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। কিছুই করতে পারিনি। আমার তো এখনও মনে হয় যে, আমরা দেশভাগের উপরে কোন ছবিও সেভাবে বানাতে পারিনি। অনেক কিছুই আমরা করিনি। সেটা আমাদের সবার দায়, কারোর একার নয়।

প্রশ্ন: আবীর কি বলবে? তোমাকে যদিও অনেক দিন আগেই নাটকের মঞ্চে দেখতে পাওয়া উচিত ছিল।

আবীর: আমি ছোট থেকে দেখছি আমার পরিবারের প্রত্যেকেই নাটক করছেন, এখনও তাঁরা নাটক করছেন রেগুলারলি। আমার পয়েন্ট অব্ ভিউটা একটু আলাদা। আমি যেহেতু বাইরে থেকে পুরো বিষয়টা দেখছি অথচ আমার সঙ্গে রেগুলার যোগাযোগ আছে, আমার মনে হয় কলকাতা শহরের থেকেও বেশি কলকাতা শহরের আশেপাশের কিছু অঞ্চলে বেশি নাটক করা হয়। অনেক সিরিয়াসলি নাটক করা হয়, দেখা হয় এবং তার একটা অভ্যাস রয়েছে। আমার একটা নিজের মতামত তৈরি হয়েছে, বলতে পারব না সেটা কতটা ঠিক বা ভুল হয়ত আরও বেশি পড়াশোনা করতে হবে ব্যাপারটা নিয়ে। আমার মনে হয়েছে, বাঙালি চিরকালই বুদ্ধিমত্তাকে একটা আলাদা গুরুত্ব দেয়, দাম দেয়। তার ফলে, নাটকের প্রতি যে সম্মানটা দেওয়া হয় এখনও আমাদের ধরণের সিনেমার ক্ষেত্রে সেই সম্মানটা আমরা পাই না। কিন্তু কোথাও গিয়ে সিনেমার সঙ্গে অর্থের যোগাযোগটা অনেক সোজাসুজি। আমাদের একটা প্রবণতা রয়েছে আমরা শিল্প বলতে আর্টকে বেশি গুরুত্ব দিই, ইন্ডাস্ট্রিকে অতটা গুরুত্ব এখনও দিতে পারিনি সেটা আমাদের আশপাশ দেখলেই বোঝা যায়। আমি হয়ত ছোট মুখে একটা বড় কথা বলে ফেললাম কিন্তু এটা হয়। এই বিবাদটা চলবে। আর সোহিনী যেটা বলল, সত্যিই এরকম নাটক আছে যেগুলো হাউসফুল হয় এবং তার টিকিটের দাম কিন্তু সিনেমার টিকিটের দামের থেকে অনেক বেশি। এবারে একটা জিনিস বুঝতে হবে, নাটক দেখতে গেলে বা রসটা পেতে গেলে একটা ন্যূনতম শিক্ষার ও অভ্যাসের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে যেটা সিনেমার ক্ষেত্রে সবসময় প্রয়োজন হয়না। আর তুমি যেটা বললে, বিশেষ কিছু মুখ দেখতে ভিড়টা বেশি হচ্ছে সেটা কিন্তু সিনেমাতেও হয়। সিনেমাতে সেই কারণেই কিন্তু বিশেষ বিশেষ কিছু মানুষকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিই যে ও থাকা মানে ভাল কাজ হবে। বড়ং আমি উল্টোভাবে দেখব যে, কোথাও গিয়ে কিন্তু সিনেমা সমৃদ্ধ হচ্ছে নাটকের মাধ্যমে। আর যদি তুমি এভাবে বল যে এঁরা গিয়ে নাটকে অভিনয় করার ফলে নাটকের দর্শক বাড়ছে সে ক্ষেত্রে আমি আবার বলব যে সিনেমা ওই জায়গা থেকে নাটককে সমৃদ্ধ করছে। নেগেটিভ আলোচনার কোনও শেষ নেই, তর্ক আমি করতেই পারি কিন্তু আমি যদি পজিটিভ অ্যাঙ্গল থেকে দেখি এটা তো একটা আদান-প্রদান চলছে দুটো মাধ্যমের মধ্যে, চলুক না। সেটা তো খুব স্বাস্থ্যকর।

সোহিনী: ইন্ডাস্ট্রি যেটা হয়, থিয়েটারের ক্ষেত্রে সেটা না এখনও তৈরি হয়নি। সেটা কিন্তু কোভিডের সময় আরও বেশি করে চোখে পড়েছে। এরপরে কি? কোনও ভবিষ্যৎ নেই। সরকার থেকেও বোধহয় সেরকম কোনও কাজ হয় না। যে গ্রান্টটা আসে, কোভিডের জন্য কেন্দ্র সরকার সেটাও অনেক কমিয়ে দিয়েছে। যে ছেলে-মেয়েগুলো কাজ করবে, তাদের তো ন্যূনতম কিছু টাকা পয়সার প্রয়োজন। আমি, অর্ণ, অনির্বাণ, মানে যারা ছবি করি তারা কিছু টাকা পাচ্ছি এবার বাকি সময়টুকু আমরা থিয়েটারে দিচ্ছি। কিন্তু যাঁরা শুধু থিয়েটারটাই করেন? এই যে লোকা দা, এই বয়সে এসে ‘মন্দার’ করে একটু পরিচিতি পেয়েছেন। তারপরে এখন লোকা দাকে বিভিন্ন জায়গায় কাস্ট করা হচ্ছে। কিন্তু তুমি রেমুনারেশন জিজ্ঞাসা কর, দেখবে কত কম টাকা পায়! আবার এটাও হয় যে, থিয়েটারের ছেলেমেয়েদেরকে নেওয়া হয় ভাল অভিনয় করবে বলে কিন্তু টাকার বেলা সেখানে তাদেরকে খুব কম টাকা দেওয়া হয়। ইন্ডাস্ট্রির তৈরি হওয়াটা খুব দরকার। ২২-২৪ বছরের ছেলে মেয়েরা এসে যখন থিয়েটার করছে, সে কিসের আশায় করবে? কিছু তো পেতে হবে! বাস ভাড়া-ট্রেন ভাড়া বাদে তাদের দুবেলা খেতে হবে, সেই টাকাটা তো তাদের পেতে হবে।

আবীর: মজার বিষয় দেখো যে এই সংলাপটা আমাদের ব্যোমকেশে রয়েছে যেটা আমরা ট্রেলারেও দেখতে পাচ্ছি যে, পেটে কিল মেরে কিন্তু শিল্প হয় না। অজিত যে বলে দর্শক হচ্ছে আসল, তাকে ছাড়া কোনও নাটক কিন্তু সফল নয়। সেই জায়গা থেকে দেখো, এটা কত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আদত অর্থে আমরা হয়ত বলছি এটা একটা ক্রাইম থ্রিলার কিন্তু এই কথাগুলোও বারবার উঠে আসছে।

প্রশ্ন: দুটো ছোট প্রশ্ন আছে, সাধারণত আমি এ ধরণের প্রশ্ন কাউকে করি না কিন্তু এখন মানুষজন বলছে এগুলো নাকি করতেই হয় না হলে সমাজ মেনে নেবে না…

আবীর: …ওই একটু মুড়ি মশলা টাইপ…

প্রশ্ন: হ্যাঁ, ওই রকমই একটু আর কি। আমি আমার বেশ কিছু বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে দেখেছি যে তারা সত্যবতীর মত বউ পেলে খুশি কারণ বরকে বিশ্বাস করে, বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু যে কজন বান্ধবীর সঙ্গে কথা হয়েছে তারা কেউ ব্যোমকেশের মত বর চায় না…

সোহিনী: কেন?

প্রশ্ন: …কারণ সন্দেহ করবে, সব সিক্রেট ধরে ফেলবে। এই বিষয়ে তোমাদের দুজনের কি মত?

সোহিনী: সত্যবতী কিন্তু যথেষ্ট পজেসিভ। কারণ, ‘হর হর ব্যোমকেশ’-এ যখন শকুন্তলার সঙ্গে দেখা করতে গেছে ব্যোমকেশ তখন কিন্তু সত্যবতী যথেষ্ট বিরক্তই হয়েছে যে কেন! আর একা গিয়েছিল, অজিতকেও নিয়ে যায় নি বুঝতে পেরেছ।

আবীর: অজিত লেখক মানুষ। আমরা দেখেছি যে শকুন্তলা দেবীর আঁকা ছবি পছন্দ হচ্ছেনা কিন্তু শকুন্তলা দেবীর ব্যাপারে প্রচন্ড খোঁজখবর নিচ্ছে তাই অজিতকে নিয়ে যাওয়ার রিস্ক নেয়নি ব্যোমকেশ। আমার মনে হয় অরিন্দম দার ছবিতে অজিত ব্যোমকেশ ও সত্যবতী এবং এদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং একটা ইউনিট। এর মধ্যে আবার সাব-ইউনিট রয়েছে। ব্যোমকেশ-অজিত একটা ইউনিট, অজিত-সত্যবতী একটা ইউনিট আবার ব্যোমকেশ-সত্যবতী একটা ইউনিট। এরকম করেই ইক্যুয়েশনগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং ভাবে উঠে এসেছে কিন্তু মজা করে তুমি যখন প্রশ্নটা করলে, হ্যাঁ! আমার মনে হয় যারা যারা ব্যোমকেশ-সত্যবতী হতে চান তাদেরকে বিশ্বাসটাও অর্জন করে নিতে হয়।

প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। সোহিনী যখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও ছবি পোস্ট করে, আমাদের কনভেনশনাল মিডিয়ার কথায় প্রত্যেক দিনে আগের থেকে সাহসী হয়ে ওঠে। ‘অমুক পোশাকে আরও সাহসী হলেন সোহিনী’। কিন্তু অভিনেতাদের কপালে এই সাহসী তকমাটা জোটেনা। আবীরের কি এটা নিয়ে কোনও কমপ্লেক্স রয়েছে? আবীর কখনও ‘সাহসী’ হল না কেন?

সোহিনী: (হেসে) রণবীর সিং হতে চাও?

আবীর: না, আমি তো সাহসী নই। ভীতু, মধ্যবিত্তপনা টাই আমার আসল শক্তি, এটা প্রথম কথা। আর দু’নম্বর, আমার মনে হয় সোহিনীর যে সাহসের কথা নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তার থেকেও বেশি চরিত্র বা স্ক্রিপ্ট পছন্দ করার ক্ষেত্রে ও যে সাহস দেখিয়েছে সেটা অ্যাপ্রিশিয়েটেড হওয়া উচিৎ। কারণ যে সাহসের কথা বলা হচ্ছে সেটাকে আমি সাহস হিসেবে দেখি না, এই যে একজন সেলফ্ ইন্ডিপেন্ডেন্ট মহিলা যিনি নিজে ভেবে নিয়েছেন যে এইটা আমার প্রফেশন হবে এবং এইটা করেই আমি আমার সংসার চালাব এবং অত্যন্ত ম্যাচিউরিটির সঙ্গে সেটাকে সামলাচ্ছেন এটা অনেক বেশি সাহসের পরিচয়।

সোহিনী: দেখেছ তো, আবীর দাকে কেন এত ভালবাসি?

একদম। আবীর দাকে সবাই ভালবাসি।

Loading

Spread the love